লন্ডনে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক রিপোর্ট ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অসম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হওয়া নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনজন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের একটি প্যানেল দাবি করেছে, সেখানে যা ঘটছে তা ‘অ্যাপারথাইড’ বা বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের পর্যায়ে পড়তে পারে, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হয় লন্ডনের কিংস কলেজ লন্ডনের একটি অনুষ্ঠানে। রিপোর্টের নাম—” আলেজড ভায়োলেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ল’ এগেন্ট মুসলিম ইন উত্তরপ্রদেশ এন্ড অসম, ইন্ডিয়া ২০২২-২৫ “। এতে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় চার বছর ধরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের এই প্যানেলে ছিলেন সোনজা বিসারকো, মারজুকি দারুসমান এবং স্টিফেন জে. র্যাপ। তাঁদের দাবি, অসম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ঘটনাগুলি ঘটছে, তা পরিকল্পিত এবং ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই দুই রাজ্যে মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটির বেশি মুসলিম বাস করেন। সেখানে প্রশাসনিক স্তরেই এমন কিছু নীতি ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরি করছে বলে অভিযোগ। বিশেষ করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারি ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল-এর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যাতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা হয়। তাঁদের মতে, এই ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অসম নিয়ে রিপোর্টে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্য করে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় অনেকের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এতে বহু মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এছাড়া জোর করে উচ্ছেদ, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া—এই ধরনের ঘটনাও বড় আকারে ঘটেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ২৪৫০ জনকে অসম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে বহু পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, তথাকথিত ‘হাফ এনকাউন্টার’-এর নামে পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তিদের শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হতে পারে। পাশাপাশি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা এবং বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্ত ঘটনার ফলে মুসলিমরা ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। দেশের আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায় পাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক ক্ষেত্রে কম বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। রিপোর্টে ভারত সরকারকে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছেও দ্রুত এই সংক্রান্ত মামলাগুলির নিষ্পত্তির আবেদন জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে এখনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।


