দক্ষিণ লেবাননের উপকূলে বিপন্ন সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণে আজীবন লড়াই করা পরিবেশ কর্মী মোনা খলিল আর নেই। ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলির সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দক্ষিণ লেবাননের টায়ার শহরের কাছে মানসৌরি সৈকতে অবস্থিত তাঁর বাড়িতে ইসরায়েলি হামলা হয়। সেই হামলায় গুরুতর আহত হন খলিল। হাসপাতালে কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাণ হারান।
মোনা খলিলের মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দক্ষিণ লেবাননে ফের ইসরায়েলি বিমান হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খলিলের দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং ‘গ্রিন সাউদার্নার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “মোনা ছিলেন পরিবেশ রক্ষায় অসাধারণ নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। সৈকতটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল যেন জীবন্ত কোনও সত্তার সঙ্গে। সূর্যাস্ত, সমুদ্রের জলরাশি এবং কচ্ছপদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা।”
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে লেবাননের দক্ষিণ উপকূলে ডিম পাড়তে আসা বিপন্ন ‘লগারহেড’ ও ‘গ্রিন সি টার্টল’ প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণে কাজ করেছেন খলিল। ১৯৯৯ সালে মানসৌরি সৈকতে একটি সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপকে ডিম পাড়তে দেখার অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি নেদারল্যান্ডসে বসবাস করলেও ওই ঘটনার পর সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। ২০০০ সালে তিনি ‘অরেঞ্জ হাউস প্রজেক্ট’ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে শুরু হওয়া এই প্রকল্প পরবর্তীকালে পরিবেশ শিক্ষা, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং সামুদ্রিক গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বছরের পর বছর ধরে তিনি কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান পর্যবেক্ষণ, সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের তথ্য সংগ্রহ এবং উপকূলীয় দূষণ ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই দক্ষিণ লেবাননের উপকূলের কিছু অংশ সংরক্ষিত এলাকার স্বীকৃতি পায় এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
২০০৬ সালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সময়ও তাঁর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তিনি নিজের প্রিয় সৈকত ছেড়ে যেতে রাজি হননি। তাঁর বন্ধু ও পরিবেশকর্মী মাহা জুমা জানিয়েছেন, “মোনা বিশ্বাস করতেন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি নিরাপদ। তিনি বাস্তুচ্যুত হতে চাননি। তাঁর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মানানসই ছিল।”
মোনা খলিলের সহকর্মীদের মতে, তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু সংরক্ষণ প্রকল্প নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করা। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘তেরে লিবান’-এর সভাপতি পল আবি রাশেদ বলেন, “কচ্ছপদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা যেমন প্রতিটি কাজে ফুটে উঠত, তেমনি মানুষের প্রতিও ছিল গভীর মমত্ববোধ। তিনি শুধু কচ্ছপদেরই রক্ষা করেননি, মানুষকেও প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হতে শিখিয়েছেন।”
পরিবেশ আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ মুখ হিসেবে মোনা খলিলের মৃত্যু লেবানন তথা সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বলেই মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

