Saturday, August 8, 2026
32.2 C
Kolkata

এক দেশ আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে তিন দেশ! মক্কায় সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের চুক্তি

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সামরিক সংঘাত এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার আশঙ্কার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করল সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। শুক্রবার মক্কায় তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। এর মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

চুক্তির পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিনটি দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে দেখা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো দেশের ওপর সামরিক আক্রমণ হলে অন্য দুই দেশ কীভাবে এবং কতটা সামরিক সহায়তা দেবে, তা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তিতে সেই সহায়তার ধরন বা নির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কায় উপস্থিত থেকে চুক্তিতে সই করেন। প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর এই সমঝোতা চূড়ান্ত হলো।

চুক্তি ঘোষণার পর তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ বলেন, এই সমঝোতা কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তৈরি করা হয়নি। তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানান, এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরক্ষামূলক একটি উদ্যোগ। একই সঙ্গে তিন দেশের অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে থাকা পুরনো সামরিক বা নিরাপত্তা চুক্তিগুলোর ওপরও এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক যোগাযোগবিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায়ও চুক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর বক্তব্য, এই সমঝোতার মাধ্যমে কোনো নতুন সামরিক জোট বা ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে একটি গোষ্ঠী তৈরি করা হচ্ছে না। এর সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের পরিকল্পনা বা নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতারও কোনো সম্পর্ক নেই।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ইতিমধ্যেই গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর প্রভাব পড়ছে তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ববাজারেও।

গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়। পরে লেবানন ও সিরিয়াতেও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বাড়ে। একই সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

ইরান ও তার সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠীর হামলার প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও পড়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও জর্ডানের মতো দেশগুলোও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহনের পথ নিরাপদ রাখা এখন ওই দেশগুলোর অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য নিরাপত্তা প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাড়লে তেল সরবরাহে বাধা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি সরকারের বড় অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনাও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আঞ্চলিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে সৌদি আরব ও অন্যান্য মিত্রকে সুরক্ষা দিতে পারবে। সেই কারণে নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—তিন দেশেরই আলাদা ধরনের সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং জোটের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী তাদের রয়েছে। দেশটি সামরিক বিমান, যুদ্ধজাহাজ, ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করছে।

অন্যদিকে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় সামরিক শক্তি এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করে আধুনিক অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তুরস্কের তৈরি ড্রোনও সৌদি আরব ব্যবহার করছে।

পাকিস্তানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে অন্য জায়গায়। দেশটি বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা বহু বছর ধরে সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে।

গত বছরও সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একটি চুক্তি করেছিল। তবে সেই সমঝোতার পর ইরানের হামলার ঘটনায় পাকিস্তান সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি সামরিক অভিযান চালায়নি। পাকিস্তান আগেই জানিয়েছে, সৌদির সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অর্থ এই নয় যে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র অন্য কোনো দেশের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হবে।

নতুন চুক্তি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যোগাযোগ রয়েছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করে থাকে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক প্রশিক্ষণ বিমান নিয়েও সহযোগিতা হয়েছে।

সৌদি আরবও তুরস্কের কাছ থেকে সামরিক ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনছে। অন্যদিকে সৌদি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পাকিস্তানের সামরিক সদস্য, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের নজির রয়েছে।

তিন দেশ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়েও একসঙ্গে কাজ করতে চাইছে। বিশেষ করে তেল ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো নিরাপদ রাখা তাদের কাছে বড় বিষয়। সৌদি আরব ইতিমধ্যে আঞ্চলিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহন রক্ষায় একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানও সেই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মক্কার এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এতদিন অনেকটাই বাইরের শক্তির নিরাপত্তা সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। এখন তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের মনে করেন, বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের একসঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে তিন দেশের রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা প্রভাব আরও বাড়াতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিন দেশ মিলে কোনো নতুন যুদ্ধজোট তৈরি করেছে। বরং তাদের প্রধান লক্ষ্য নিজেদের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তিটির প্রভাব কতটা হবে, তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে। বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তখন এই প্রতিরক্ষা সমঝোতার বাস্তব গুরুত্ব সামনে আসতে পারে।ভারতও এই চুক্তির দিকে নজর রাখছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। ইরানের পক্ষ থেকেও চুক্তি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Hot this week

E20 পেট্রোলে উচ্চমাত্রার ক্লোরাইডে ইঞ্জিনের স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা

কেন্দ্র সরকার, আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে...

শিক্ষক নিয়োগে ২০২৫-এর বিধিই মানা হবে, দুর্নীতি আটকাতে কড়া নির্দেশ এসএসসির

এসএসসি-র ২০১৬ সালের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট পুরো...

মসজিদের লাউডস্পিকার খুলতে পুলিশের মৌখিক নির্দেশের! লিখিত আদেশ না থাকায় বাড়ছে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় মসজিদের লাউডস্পিকার খুলে ফেলার জন্য পুলিশ...

ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলনের মঞ্চে নেহা বোরাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হল কালি, হামলার পরও থামেনি বক্তৃতা!

ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্রদের আন্দোলন...

Topics

E20 পেট্রোলে উচ্চমাত্রার ক্লোরাইডে ইঞ্জিনের স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা

কেন্দ্র সরকার, আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে...

শিক্ষক নিয়োগে ২০২৫-এর বিধিই মানা হবে, দুর্নীতি আটকাতে কড়া নির্দেশ এসএসসির

এসএসসি-র ২০১৬ সালের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট পুরো...

মসজিদের লাউডস্পিকার খুলতে পুলিশের মৌখিক নির্দেশের! লিখিত আদেশ না থাকায় বাড়ছে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় মসজিদের লাউডস্পিকার খুলে ফেলার জন্য পুলিশ...

ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলনের মঞ্চে নেহা বোরাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হল কালি, হামলার পরও থামেনি বক্তৃতা!

ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্রদের আন্দোলন...

মোদীর বৈঠকে ৩ মুসলিম সহ বাকি NCPI-এর সাংসদরা! কী বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী?

শুক্রবার সকালে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর...

সংরক্ষণে ‘সাব-কোটা’ দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা, আপত্তি জানাল কেন্দ্র

কেন্দ্রের সমাজকল্যাণ মন্ত্রক আদালতে জানিয়েছে, সংরক্ষণের মূল লক্ষ্য হল...

Related Articles

Popular Categories