জি৭ শীর্ষসম্মেলনকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে শুরু হওয়া বাকযুদ্ধ আরও তীব্র আকার নিল। ট্রাম্পের একের পর এক মন্তব্যের জবাবে এবার সরাসরি তাঁকে নিজের জনপ্রিয়তার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিলেন মেলোনি। একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যকে তিনি “বিনা প্ররোচনায় আক্রমণ” বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত জি৭ শীর্ষসম্মেলনের পর। একটি ইতালীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য নাকি জোরাজুরি করেছিলেন মেলোনি। সেই প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলায় উনি খুব খুশি হয়েছেন। আমার কথা বলার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু উনি আমার সঙ্গে একটা ছবি তোলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। আমি হয়তো ছবি তুলতাম না, কিন্তু আমার খারাপ লেগেছিল। তাই ছবি তুলেছি।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ইতালির প্রধানমন্ত্রী। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য সম্পূর্ণ মনগড়া এবং বানানো। আমি স্তম্ভিত। বুঝতে পারি না কেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের বন্ধুদের সঙ্গেই এমন আচরণ করেন। এটা প্রথমবার নয়।”
সাম্প্রতিক পোস্টে ট্রাম্পকে আরও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন মেলোনি। তিনি লেখেন, “বিনা প্ররোচনায় অনবরত এই আক্রমণের কোনও অর্থ নেই। আপনার বন্ধু হয়ে জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে আমার কখনও কোনও লাভ হয়নি। আপনার সঙ্গে সম্পর্কের উপর আমার জনপ্রিয়তা নির্ভর করে না। ইতালির জাতীয় স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পারছি, তার উপরই আমার জনপ্রিয়তা নির্ভর করে।”
ইরান ইস্যুতেও দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে ট্রাম্প সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু ন্যাটোর সদস্য হয়েও ইতালি সেই প্রস্তাবে সায় দেয়নি। বরং মার্কিন নীতির সমালোচনাও করেছিলেন মেলোনি। সেই প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতে আমেরিকাকে কোনও সাহায্য করেনি ইতালি।
এর জবাবে মেলোনি স্পষ্ট করে দেন, ইতালিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের প্রশ্নে তাঁর সরকার দেশের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি লেখেন, “ইতালিতে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি নিয়ে আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা ইতালির জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবেই। চুক্তি অনুযায়ী যা করার, আমরা তাই করেছি। ইতালি একটি সার্বভৌম দেশ ছিল, আছে এবং থাকবে।”
এরপর ট্রাম্প সমাজমাধ্যমে দাবি করেন, ইতালিতে মেলোনির জনপ্রিয়তা নাকি ক্রমশ কমছে এবং সেই কারণেই তিনি আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যেরও কড়া জবাব দিয়েছেন মেলোনি। তিনি বলেন, “আমার জনপ্রিয়তা নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে। আপনি বরং নিজের জনপ্রিয়তার দিকে নজর দিন।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, একসময় ট্রাম্প ও মেলোনির সম্পর্ক যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিল। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ইউরোপের একমাত্র শীর্ষ প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেলোনি। তবে পরবর্তীতে একাধিক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য এবং বিশেষ করে পোপ লিওকে ঘিরে বিতর্কিত মন্তব্যের পর দুই নেতার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ট্রাম্প-মেলোনি দ্বন্দ্বের প্রভাব ইতিমধ্যেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তাঁর নির্ধারিত আমেরিকা সফর বাতিল করেছেন। ফলে ওয়াশিংটন ও রোমের মধ্যে কূটনৈতিক শৈত্য আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের।


