মহারাষ্ট্রে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভোটার তালিকা তৈরির পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরওদের আরও বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এস চোকালিঙ্গম। গত ২৪ সেপ্টেম্বর পাঠানো ওই চিঠিতে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ডিজিটাল ব্যবস্থা ECINet-এ একাধিক পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।চিঠির মূল বক্তব্য হল, মাঠ পর্যায়ে কাজ করা ইআরওরা যেন নিজেদের দায়িত্ব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বর্তমানে ECINet-এ নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ইআরওদের সামনে সীমিত কয়েকটি বিকল্প থাকে। তার বাইরে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সব ক্ষেত্রে নেই বলে মহারাষ্ট্রের সিইও মনে করছেন। ফলে কোনও ভোটার প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরেও যদি তাঁর বিষয়টি সফটওয়্যারের নির্দিষ্ট ব্যবস্থার সঙ্গে না মেলে, তখন ইআরওদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলাতেই সফটওয়্যারে নতুন ব্যবস্থা যোগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।এসআইআর চলাকালীন পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান ভোটারের তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। বয়স, বাবা-মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য তথ্যের সঙ্গে আগের তালিকার তথ্যের অমিল থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। সেই কারণে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নোটিস পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে বলা হচ্ছে। নথি যাচাইয়ের পর ভোটারের দাবি গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ইআরওদের।মহারাষ্ট্রের সিইও মনে করছেন, কোনও ভোটার যথাযথ নথি জমা দিলে এবং সেই নথি ইআরওর কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর হাতেই থাকা উচিত। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী ভোটারের নাম তালিকায় রাখা বা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ইআরওদের দেওয়া প্রয়োজন। আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরির দায়িত্ব তাঁদের উপর থাকলেও সফটওয়্যারের কাঠামো যদি সেই দায়িত্ব পালনে বাধা তৈরি করে, তাহলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।শুনানির বিষয়েও চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে কোনও ভোটারকে নোটিস দেওয়া হলে তাঁকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শুনানিতে হাজির হতে হতে পারে। কিন্তু বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ভোটার কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে থাকা নাগরিকদের পক্ষে সবসময় নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে শুনানিতে অংশ নেওয়া সহজ নয়। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে ECINet-এ ‘শুনানি থেকে ছাড়’ দেওয়ার আলাদা একটি বিকল্প রাখার কথা বলা হয়েছে।অর্থাৎ কোনও ভোটার যদি প্রয়োজনীয় নথি আগেই জমা দিয়ে থাকেন এবং ইআরও সেই নথি যাচাই করে সন্তুষ্ট হন, তাহলে প্রত্যেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শুনানির প্রয়োজন নাও হতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সফটওয়্যারে থাকলে প্রক্রিয়াটি আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনও নোটিস সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। বুথ স্তরের আধিকারিক বা বিএলওরা প্রয়োজনে ভোটারের বাড়িতে গিয়ে নথি সংগ্রহ করে তা অনলাইনে জমা দিতে পারবেন। এরপর ইআরও সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।শুধু শুনানি নিয়ে নয়, কী ধরনের নথি গ্রহণ করা হবে, তা নিয়েও মহারাষ্ট্রের সিইও পরিবর্তনের কথা বলেছেন। নির্বাচন কমিশনের তরফে নির্দিষ্ট কয়েকটি নথির তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেগুলি দেখিয়ে ভোটাররা নিজেদের দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সমাজের সব মানুষের কাছে ওই নথিগুলি থাকা সম্ভব নয়। বিশেষ করে গৃহহীন মানুষ, ভবঘুরে বা যৌনকর্মীদের মতো প্রান্তিক মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট তালিকার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী ‘অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি’ গ্রহণের সুযোগ রাখার দাবি জানানো হয়েছে।এই বিতর্কের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভিতরে ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সফটওয়্যার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় রাজ্য ও স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের ভূমিকা কমে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ভাবে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজের জন্য আগে ‘ইআরওনেট’ নামে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা হত। বর্তমানে ECINet-এর মাধ্যমে সেই কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় ইআরওদের নাম সংযোজন বা বাদ দেওয়ার ক্ষমতা কতটা রয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ভোটার তালিকা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে স্থানীয় আধিকারিকদের ভূমিকা যথেষ্ট থাকা প্রয়োজন।গোয়ার একটি ঘটনাও এই বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। সেখানে তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে কিছু ভোটারের নাম নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। শুনানির পর ইআরওরা ৯৭ জনকে যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত সফটওয়্যারে কার্যকর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ ওঠে। গোয়ার নির্বাচন দফতর নাম ফেরানোর জন্য ‘রোলব্যাক’ ব্যবস্থা চালুর অনুরোধ করেছিল। অভিযোগ, সময়মতো সেই ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় ওই ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ফেরানো সম্ভব হয়নি।এই ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে, কোনও ইআরও যদি শুনানি করে একটি সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সফটওয়্যার সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সুযোগ না দিলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কী ভাবে সম্পূর্ণ হবে। মহারাষ্ট্রের সিইওর প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। তাঁর মতে, আইন অনুযায়ী যাঁদের হাতে ভোটার তালিকা তৈরির দায়িত্ব রয়েছে, তাঁদের সফটওয়্যার ব্যবস্থাতেও সেই ক্ষমতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।আইন অনুযায়ী, একটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্ব ইআরওদের উপর থাকে। তাই ভোটারের নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।এদিকে মহারাষ্ট্রে এসআইআর প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। গত ৩১ অগস্ট খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে মোট প্রায় ৯.৭৯ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭.৭২ কোটি নাম খসড়া তালিকায় রয়েছে। প্রায় ২.০৭ কোটি ভোটারের গণনা ফর্ম পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রায় ১.২২ কোটি ভোটারের ক্ষেত্রে পুরনো তথ্যের সঙ্গে অমিল বা তথ্য না মেলার বিষয় সামনে এসেছে।তবে খসড়া তালিকায় নাম না থাকা মানেই কোনও ভোটারের নাম চূড়ান্ত ভাবে বাদ পড়ে যাওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট ভোটারদের দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে নিজেদের নাম তালিকায় ফেরানোর আবেদন করা যাবে।এসআইআর নিয়ে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমাও নির্বাচন কমিশন বাড়িয়েছে। আগে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় থাকলেও তা বাড়িয়ে ১২ অক্টোবর করা হয়েছে। ফলে ভোটারদের নিজেদের নাম এবং তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আরও সময় মিলছে। নোটিস পাওয়া ভোটারদের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় নথি জমা ও বক্তব্য জানানোর সুযোগ রয়েছে।এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্রের সিইওর চিঠি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রস্তাবগুলি কার্যকর হলে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে ইআরওদের হাতে আরও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় থাকা ভোটারদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।শেষ পর্যন্ত ECINet-এ কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, ইআরওদের কতটা অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট নথির বাইরে অন্য প্রমাণ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে কি না, তা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। মহারাষ্ট্রে এসআইআর প্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়গুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভোটার তালিকায় নাম রাখা, বাদ দেওয়া এবং সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রযুক্তি ও মাঠ পর্যায়ের আধিকারিকদের ভূমিকার মধ্যে কী ভাবে সমন্বয় করা হবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
Popular Categories

