ভারতে অপুষ্টির সমস্যা যে এখনও কতটা গুরুতর, তা বিভিন্ন সমীক্ষার রিপোর্টেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশের বহু শিশু আজও প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের একটি বড় অংশ শারীরিক বৃদ্ধিতে পিছিয়ে রয়েছে। অনেকের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম, আবার অনেকেই অতিরিক্ত রোগা। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টও জানাচ্ছে—দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না। এই বাস্তবতার মাঝেই মধ্যপ্রদেশের একটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে সমাজের একাংশের আচরণ নিয়ে।
মধ্যপ্রদেশের সেহর জেলার সতদেব এলাকায় সম্প্রতি একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ দুধ নদীতে ঢেলে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। চৈত্র নবরাত্রি উপলক্ষে পাতালেশ্বর মহাদেব মন্দির-এ টানা ২১ দিনের একটি যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল। বহু ভক্ত এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে সেখানে ভিড় জমিয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানের শেষ দিনে ‘অভিষেক’-এর অংশ হিসেবে প্রায় ১১ হাজার লিটার দুধ নর্মদা নদীতে ঢেলে দেওয়া হয়। ট্যাঙ্কারে করে আনা দুধ পাইপের মাধ্যমে নদীতে ফেলা হয়। সবুজ জলের উপর সাদা দুধের স্তর তৈরি হতে দেখা যায়, যা দূর থেকেও চোখে পড়ে। অনেকে সেই দুধ মেশানো জলে নেমে ধর্মীয় আচার পালন করেন এবং পুণ্য অর্জনের বিশ্বাসে অংশ নেন।
স্থানীয়দের মতে, এই রীতি বহুদিন ধরেই চলে আসছে। প্রতিবছর এই সময়ে এখানে বিশাল আয়োজন করা হয়। যজ্ঞ চলাকালীন প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে ভেষজ উপাদানও থাকে। অনেক ভক্ত আবার মূল্যবান ধাতুও অর্পণ করেন। এই অঞ্চলকে ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থান প্রাচীন ঋষিদের তপস্যার সঙ্গে জড়িত এবং এখানেই ভগবান শিবের এক বিশেষ রূপের আবির্ভাব ঘটেছিল বলে প্রচলিত রয়েছে। ইতিহাস বলছে, অহলিয়াবাই হলকার শাসনামলেও এই জায়গা আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
তবে এত বড় পরিমাণ দুধ নদীতে ঢেলে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যেখানে দেশের বহু মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা, পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, সেখানে এমনভাবে খাদ্য নষ্ট করা কতটা যুক্তিযুক্ত? ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্ব স্বীকার করেও অনেকের মত, বাস্তব পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
শুধু সামাজিক নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, নদীর জলে দুধ মিশে গেলে জলের গুণগত মানের পরিবর্তন হতে পারে। এতে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যেতে পারে, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একদিকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, অন্যদিকে দেশের বাস্তব সমস্যা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা নিয়েই এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।


