নবম শ্রেণির শিল্পশিক্ষার পাঠ্যবইয়ে সিন্ধু সভ্যতার বিখ্যাত ‘ড্যান্সিং গার্ল’ মূর্তির পরিবর্তিত ছবি ব্যবহারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত অবস্থান বদল করল ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি)। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে পাঠ্যবইয়ে এই প্রত্নবস্তুর আসল ছবিই ব্যবহার করা হবে।সম্প্রতি এনসিইআরটির নবম শ্রেণির নতুন শিল্পশিক্ষার বই ‘মধুরিমা’-তে মহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া বিখ্যাত ব্রোঞ্জের ‘ড্যান্সিং গার্ল’ মূর্তির একটি ছবি প্রকাশিত হয়। তবে সেই ছবিতে মূর্তিটির খোলা ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। মূল প্রত্নবস্তুর সঙ্গে বইয়ে প্রকাশিত ছবির বেশ কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে মূর্তির শরীরের উপরের অংশে এমনভাবে ছায়া ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে মূল ভাস্কর্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে দেখা না যায়।এই ছবি প্রকাশের পর ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ এবং শিল্প-গবেষকদের একাংশ প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের মতে, একটি ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর ছবি পরিবর্তন করে দেখানো ঠিক নয়। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। সংবাদ সংস্থা পিটিআই এনসিইআরটির ডিরেক্টর দিনেশ সাকলানির কাছে জানতে চায়, বিতর্কিত ছবির পরিবর্তে আসল ছবি ব্যবহার করা হবে কি না। উত্তরে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, হ্যাঁ, ভবিষ্যতে মূল ছবিই পাঠ্যবইয়ে রাখা হবে।এই বিতর্কে মুখ খুলেছেন শিক্ষাবিদ ও লেখক মিশেল ড্যানিনোও। তিনি এনসিইআরটির ষষ্ঠ শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই তৈরির কমিটির প্রধান ছিলেন। ড্যানিনোর দাবি, তাঁকে বলা হয়েছিল যে ‘ড্যান্সিং গার্ল’-এর আসল ছবি নাকি কম বয়সি ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপযুক্ত নয়। তবে তিনি এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন।ড্যানিনো জানান, তাঁদের দল বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলেছিল। অধিকাংশ শিক্ষকই বলেছিলেন, এতদিন এই মূর্তির ছবি নিয়ে কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি। তাঁর মতে, নগ্নতাকে অশোভন বা অনুপযুক্ত হিসেবে দেখার ধারণা অনেক পুরনো এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন।তিনি আরও বলেন, ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করার কথা বলা হলেও এমন পদক্ষেপ সেই লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। তাঁর কথায়, ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাস শেখানোর অধ্যায়ে যদি ‘ড্যান্সিং গার্ল’-কে তার আসল রূপে দেখানো না যায়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়।ড্যানিনো মনে করেন, কোনও ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর ছবি প্রয়োজন ছাড়া পরিবর্তন করা উচিত নয়। এতে মূল নিদর্শনের সঠিক রূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইতিহাসে অনেক সময় বিখ্যাত শিল্পকর্মের ওপর পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা মূল সৃষ্টির ভাবনাকে বিকৃত করেছে।প্রসঙ্গত, প্রায় ৪৬০০ বছর পুরনো এই ব্রোঞ্জের মূর্তিটি মহেঞ্জোদাড়ো থেকে উদ্ধার হয়েছিল। এটি সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম পরিচিত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মূর্তিটি ‘লস্ট-ওয়াক্স’ পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছিল, যা আজও পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তীসগঢ়ের কিছু এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। শুধু ইতিহাস নয়, ভারতীয় শিল্প ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ‘ড্যান্সিং গার্ল’ দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। তাই পাঠ্যবইয়ে তার আসল রূপ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন।
Popular Categories


