বিগত প্রায় আট দশক ধরে দেশকে আর্থিকভাবে সচল রেখেছে মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প (এমএসএমই)। কিন্তু কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকারের ভুল অর্থনৈতিক নীতি এবং একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্তের জেরে আজ এই দুটি ক্ষেত্রই সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই দেশে কোনো বড় আর্থিক সংকট এসেছে, তখনই মোদী সরকারের ভ্রান্ত পরিকল্পনার কারণে এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাই সবার আগে বলির পাঁঠা হয়েছেন। স্বৈরাচারী কায়দায় চাপিয়ে দেওয়া নোটবাতিল থেকে শুরু করে লকডাউন বা করোনাকালের অব্যবস্থা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সেক্টরকে চরম ধাক্কা খেতে হয়েছে। এবার পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে ময়দানে নেমেছেন স্বয়ং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন।
সোমবার মুম্বইয়ে আয়োজিত স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী দেশের এই গভীর সংকটের কথা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক স্তরে পণ্য পরিবহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে দেশ থেকে রপ্তানির অর্ডার একধাক্কায় অনেক কমে গেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদেশি মুদ্রার নিরিখে ভারতীয় টাকার রেকর্ড পতন ঘটছে এবং সামগ্রিক শিল্পোৎপাদনে এক কালো ছায়া নেমে এসেছে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার যে, দেশের কোটি কোটি মানুষের রুটিরুজি জোগানো ক্ষুদ্র শিল্প আগামী দিনে এক চরম অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছে। তবে নিজের সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা আড়াল করতে তিনি চিরাচরিতভাবে সমস্ত দায় বিশ্বজনীন সংকটের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন এবং এই পরিস্থিতির মোকাবিলা দেশের সমস্ত মানুষকে একসঙ্গে করার আজব দাওয়াই দিয়েছেন।
বিজেপি সরকারের কর্পোরেট-বান্ধব নীতির কারণে ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসায়ীরা যখন ধুঁকছেন, তখন অর্থমন্ত্রী সিডবি-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে এগিয়ে এসে প্রয়োজনীয় পুঁজির জোগান দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাজারের সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মসৃণ রাখা এখন সরকারের কাছে মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ঢাকতে উল্টে দেশের সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার জ্ঞান দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে এই চরম আর্থিক মন্দা নিয়ে সরকারের দিকে আঙুল তোলায় বিরোধীদের তীব্র নিশানা করে তিনি দাবি করেছেন যে, দেশের মানুষকে যেন ভয় না দেখানো হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, বড় বড় পুঁজিপতি বন্ধুদের লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দেওয়া এই বিজেপি সরকার যখন সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দেশের মূল অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডটিকে বাঁচাতে কোনো দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে পারে না, তখনই তারা ভিন্নমত দমন করতে এবং নিজেদের দোষ ঢাকতে একজোট হওয়ার এই ফাঁকা বুলি আউড়ে থাকে।


