বিহারের রাজনীতিতে বহু বছর ধরেই জাতিগত সমীকরণকে ভোটের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। ভোটের আগে কোন জাতির ভোট কোন দলের দিকে যাবে, তা নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলি কৌশল ঠিক করে। তবে এবার সেই পরিচিত ছবিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজধানী পাটনার বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফল রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে বাঁকিপুরকে বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে ধরা হত। এই কেন্দ্রে কায়স্থ ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি ভূমিহার, রাজপুত, ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সম্প্রদায়ের ভোটও বিজেপির পক্ষে যাবে বলেই এতদিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল। সেই কারণেই এই আসনে বিজেপি বারবার ভালো ফল করেছে।
পাটনা সাহিব লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বাঁকিপুরে অতীতে বিজেপির টিকিটে শত্রুঘ্ন সিনহা ও রবিশঙ্কর প্রসাদের মতো নেতারা জয়ী হয়েছেন। বিদায়ী বিধায়ক নীতিন নবীনও বিজেপির পরিচিত মুখ। তাই এবারের ফল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত।
এই কেন্দ্রে কায়স্থ, যাদব, মুসলিম, চন্দ্রবংশী, বানিয়া, দলিত, ভূমিহার, ব্রাহ্মণ, রাজপুত, কুর্মি ও কুশওয়াহা—বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটারের উপস্থিতি রয়েছে। এত বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক সমীকরণের মধ্যেও জনসুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছেন।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, প্রশান্ত কিশোর মোট ভোটের ৪৯ শতাংশেরও বেশি পেয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপির ভোট নেমে এসেছে প্রায় ৩৪ শতাংশে। আর রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ১১ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছে। ফলে মূল লড়াইয়ে বিজেপি ও আরজেডি—দুই বড় দলই বড় ধাক্কা খেয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। বরং ভোটারদের মানসিকতার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতদিন যে কেন্দ্রে জাতিগত সমীকরণকে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করা হত, সেখানে এবার অনেক ভোটার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক কাজ এবং বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকেও নজর দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিজেপির পাশে ছিল তাদের একাধিক জোটসঙ্গীর সমর্থন। তবুও দলটি আগের তুলনায় বড় ধাক্কা খেয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিজেপির ভোটের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বিহারের এই ফল আগামী দিনের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যদি এই প্রবণতা অন্য কেন্দ্রেও দেখা যায়, তাহলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াই আরও জমে উঠতে পারে।


