অযোধ্যা পাহাড়ের জঙ্গল ঘেরা দুর্গম গ্রাম জিলিনসেরেং-এ সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি মাটির ঘরে জড়ো হয় ৪৫ জন শিশু। তাদের হাতে স্লেট, চক আর স্বপ্ন। এই শিশুদের শিক্ষক একজন আদিবাসী গৃহবধূ, মালতি মুর্মু, যিনি নিজের সংসারের কাজের ফাঁকে গ্রামের শিশুদের জন্য একটি পাঠশালা গড়ে তুলেছেন। ২০১৯ সালে বিয়ের পর এই গ্রামে এসে তিনি দেখেছিলেন, শিক্ষার আলো এখানকার শিশুদের কাছে প্রায় অচেনা। গ্রামে একটি বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও, সেখানে সাঁওতাল শিশুদের মাতৃভাষা অলচিকি শেখানো হয় না। এই শূন্যতা পূরণ করতেই মালতি নিজের ঝুপড়ি ঘরে শুরু করেছিলেন শিক্ষাদান। আজ সেই ঝুপড়ি গ্রামবাসীদের সাহায্যে মাটির দেয়ালে রূপ নিয়েছে, আর মালতির উদ্যোগ গ্রামের শিশুদের জীবনে এনে দিয়েছে নতুন আশা।
মালতি উচ্চমাধ্যমিক পাস। কোনো বড় ডিগ্রি বা সরকারি সাহায্য ছাড়াই তিনি শিশুদের পড়াশোনার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন। প্রতিদিন সকালে তার কাছে আসা ৪৫ জন শিশুকে তিনি শেখান অলচিকি, বাংলা আর ইংরেজি—সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। তার একটাই লক্ষ্য, “আমি চাই গ্রামের কোনো শিশু যেন নিরক্ষর না থাকে।” এই কথা বলতে গিয়ে তার চোখে দৃঢ়তা আর গ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভরসা ঝরে পড়ে। শুধু শিক্ষাই নয়, অলচিকি ভাষায় পড়াশোনার মাধ্যমে তিনি শিশুদের নিজেদের সংস্কৃতি আর পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে রাখছেন।
এই পথ সহজ নয়। চার বছরের একটি ছেলে আর দেড় মাসের একটি শিশুকে সামলানোর পাশাপাশি সংসারের কাজও তাকেই করতে হয়। তবু, প্রতিদিন সকালে শিশুদের পড়াতে তার একটুও ক্লান্তি নেই। তার স্বামী বাঁকা মুর্মু এই কাজে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাঁকা বলেন, “পঞ্চম শ্রেণির পর গ্রামের অনেক শিশুই স্কুল ছেড়ে দেয়। নিকটতম স্কুল ১০-১২ কিলোমিটার দূরে, জঙ্গলের পথে। অনেকেই আর যায় না। আমরা নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ঝাড়গ্রাম থেকে অলচিকির বই কিনে শিশুদের পড়াই।” এই দম্পতির এই প্রচেষ্টা শুধু শিক্ষার জন্য নয়, গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যও একটি লড়াই।
গ্রামবাসীরাও মালতির এই কাজের প্রশংসায় মুখর। স্থানীয় বাসিন্দা সুনীতা মান্ডি বলেন, “মালতির জন্য আমাদের ছেলেমেয়েরা নিয়মিত পড়তে পারছে। লকডাউনের সময়ও সে পড়াশোনা বন্ধ হতে দেয়নি। আমরা চাই এটা এভাবেই চলুক।” গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনাদি টুডুও মালতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আমাদের স্কুলে অলচিকি পড়ানো হয় না। মালতি নিজের উদ্যোগে শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দিচ্ছেন, এটা সত্যিই অনেক বড় কাজ।”
মালতির এই পাঠশালা শুধু শিক্ষার জায়গা নয়, এটি সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার একটি প্রয়াস। অলচিকিতে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছেন, আর তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করছেন। তার এই কাজ গ্রামের মানুষের কাছে শিক্ষার এক নতুন দিশা দেখিয়েছে।
জিলিনসেরেং গ্রামের এই গৃহবধূ প্রমাণ করে দিয়েছেন, শিক্ষা কোনো বড় স্কুল বা সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে না। একজন মানুষের ইচ্ছা আর সমাজের সমর্থন থাকলেই অনেক কিছু সম্ভব। মালতি মুর্মু আজ শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যৎ আর গ্রামবাসীদের জন্য এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। তার এই আলো আরও অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ুক, এই প্রত্যাশাই রাখে অযোধ্যা পাহাড়ের এই ছোট্ট গ্রাম।


