দুর্গাপুজোর থিম কেমন হবে, প্রতিমার রূপই বা কেমন হওয়া উচিত—এবার সেই বিষয়েই নিজেদের বক্তব্য জানাতে উদ্যোগী বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। কলকাতার বিভিন্ন পুজো কমিটিকে পাঠানো একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। বুধবার সল্টলেকের ইজেডসিসিতে দুর্গাপুজো নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছে সংগঠনটি। সেখানে পুজো উদ্যোক্তা, বিভিন্ন কমিটির প্রতিনিধি ছাড়াও সাধু-সন্ত ও পুরোহিতদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
ভিএইচপির তরফে জানানো হয়েছে, দুর্গাপুজোর ধর্মীয় ভাবনা, পবিত্রতা এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রাখাই এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। সংগঠনের বক্তব্য, সাম্প্রতিক সময়ে থিমের নামে অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রতিমা বা মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে, যা হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উৎসবের চাকচিক্যের মধ্যে পুজোর মূল ভাবনা হারিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
তবে বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস বলছে, সময়ের সঙ্গে পুজোর ধরনও বদলেছে। গত কয়েক বছরে কলকাতা এবং শহরতলির বহু পুজো মণ্ডপে সামাজিক সমস্যা, মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প ও প্রযুক্তিকে থিম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। করোনার সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা থেকে শুরু করে নারীজীবন, পরিবেশ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি—বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে মণ্ডপসজ্জায়। অভিনব প্রতিমা ও শিল্পকর্মের কারণে বহু পুজো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও পরিচিত হয়েছে। বাংলার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভিএইচপির এমন উদ্যোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, পুজোর শিল্পভাবনা এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনও নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে কি না। যদিও সংগঠনের তরফে দাবি করা হয়েছে, তারা থিমের বিরুদ্ধে নয়। তবে থিম তৈরি করতে গিয়ে ধর্মীয় রীতি ও প্রতিমার প্রচলিত মর্যাদা যেন নষ্ট না হয়, সেটাই তাদের বক্তব্য।
ভিএইচপির দক্ষিণবঙ্গের প্রচার-প্রসার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত রক্তিম দাশের কথায়, পুজোর আড়ম্বর বাড়াতে গিয়ে অনেক সময় ধর্মীয় আবেগ পিছনে চলে যাচ্ছে। তাই পুজোর পরিবেশকে আরও সাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যনির্ভর করার জন্যই এই আলোচনা। বৈঠকে আমন্ত্রণ পাওয়া পুজো উদ্যোক্তারা অবশ্য বিষয়টি নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাননি। হাতিবাগান সর্বজনীনের উদ্যোক্তা শাশ্বত বসু জানিয়েছেন, বৈঠকে কী আলোচনা হয়, তা শুনেই মত জানাবেন তাঁরা।
ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন উকিলের মতে, সাবেকি রীতি এবং আধুনিক শিল্প—দুইয়েরই প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, শুধু ধর্মীয় আচার মেনে চললেই হবে না, আবার শিল্পের নামে পুজোর মূল ভাবনাও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। বাংলার দুর্গাপুজোর সাফল্যের পিছনে এই দুই ধারার সমন্বয়ই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তিনি।

