গুজরাতে জন্ম নেওয়া হাসান শাহ নামে এক বাংলাভাষী যুবককে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা ঘটেছে সাতক্ষীরা জেলার বঙ্গোপসাগরের ধারে মান্দারবাড়িয়া চরে। হাসানের সঙ্গে আরও ৭৭ জনকে নৌকায় চাপিয়ে এনে এই চরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, এই দলের মধ্যে হাসানসহ তিনজন জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। তবে ভারতীয় বাহিনী তাদের নিজ দেশে ফেরত নিতে অস্বীকার করে বাংলাদেশের মাটিতে ফেলে গেছে।
হাসান শাহ গুজরাতের সুরাতে একটি বস্তিতে স্ত্রী ও চার সন্তানের সঙ্গে বসবাস করতেন। তিনি জানান, গত এপ্রিলের শেষ দিকে গুজরাত পুলিশ তাঁর বাড়িতে অতর্কিত হানা দেয়। পরিবারের কাছ থেকে তাঁকে আলাদা করে হাত-পা বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র, আধার কার্ড এবং বিবাহের শংসাপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আটকে রাখার পর তাঁকে অন্যদের সঙ্গে উপকূলরক্ষী বাহিনীর একটি জলযানে তোলা হয়। এরপর মে মাসের শুরুতে সেই জলযান বঙ্গোপসাগরে মান্দারবাড়িয়া চরের কাছে এসে থামে। হাসান বলেন, “আমাদের লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে রাইফেল দেখিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলা হয়। আমরা বাধ্য হয়ে সাঁতরে চরে পৌঁছাই।”
এরপর বাংলাদেশের উপকূলরক্ষীরা তাঁদের উদ্ধার করে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানায় আটকের পর আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের নির্দেশে তাঁদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। হাসানের কাছে থাকা নথিপত্রে দেখা যায়, তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এবং জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক। তবে বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, হাসানের বাবা প্রয়াত মুন্না শাহ নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কিন্তু হাসান নিজে জন্মেছেন এবং বড় হয়েছেন গুজরাতে।
এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পটভূমিও রয়েছে। গত ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা শুরু হয়। এই সময় গুজরাতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাঙভি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের একটি সূত্র জানায়, ৭ মে থেকে ৩ জুলাইয়ের মধ্যে ভারত থেকে ১,৮৮০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে। এর মধ্যে হাসানের মতো ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন বলে অভিযোগ।
ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসানকে গুজরাতের বস্তি থেকে তুলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে নৌকায় চাপানো হয়। তারপর তাঁকে এবং অন্যদের সাতক্ষীরার সুন্দরবনের চরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলছে, জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকদের এভাবে বাংলাদেশে পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ভারত সরকারের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং হাসানসহ অন্য ভারতীয় নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ এই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছে। অনেকে বলছেন, এটি দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি তুলেছেন।


