বেঙ্গালুরুর শ্রী সৌভাগ্য ললিতা নার্সিং কলেজে কাশ্মীরি মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব ও বোরখা পরার কারণে এক অমানবিক অত্যাচারের শিকার হতে হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে এই ছাত্রীদের ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, লেকচার ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, এমনকি তাদের বহিষ্কারের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমাজে বিভেদের বীজ বপন করছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত হানছে।
জম্মু ও কাশ্মীর ছাত্র সংগঠন জানিয়েছে, কলেজের চেয়ারম্যান একদিন হঠাৎ চলমান ক্লাসে ঢুকে হিজাব ও বোরখা পরা ছাত্রীদের বেরিয়ে যেতে আদেশ দেন। তাদের জোর করে শ্রেণীকক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং ধর্মীয় পোশাক পরতে থাকলে ভর্তি বাতিল করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ছাত্রীরা যখন শান্তভাবে জানতে চান এই নির্দেশ কোন নিয়মের আওতায় দেওয়া হচ্ছে, তখন তাদের দাম্ভিকভাবে বলা হয়, “এটা আমাদের কলেজ, এখানে শুধু আমাদের নিয়ম চলে।” এই উত্তরে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কলেজ প্রশাসনের দাবি, অন্য ছাত্ররা নাকি হিজাব পরা ছাত্রীদের উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করছে। এই অজুহাতকে হাতিয়ার করে তারা এই বৈষম্যমূলক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু এর পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান এমনও বলেছেন যে “হিজাব বা পর্দা দেশের কোথাও মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের জন্য মানা, এমনকি কাশ্মীরেও।” এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি আরও দাবি করেন, “আমাদের কলেজে সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ বা মৌলিক অধিকার খাটে না।” এমনকি তিনি এই অদ্ভুত যুক্তি দেন যে হিজাব পরা ছাত্রীদের দেখে রোগীরা নাকি ভয় পাবেন। এই বক্তব্যকে সংগঠন “অযৌক্তিক ও ইসলামোফোবিক স্টেরিওটাইপ” বলে চিহ্নিত করেছে, যা শুধু ছাত্রীদের পরিচয়ই কেড়ে নিচ্ছে না, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকেও অপমান করছে।
জেকেএসএ-র সভাপতি নাসির খুয়েহামি কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার কাছে একটি চিঠিতে লিখেছেন, “এই কাশ্মীরি মেয়েরা হিজাব ও বোরখা পরার জন্য পদ্ধতিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তাদের অপমান করা হয়েছে এবং শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এই পোশাক তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সম্মান ও পরিচয়ের অংশ।” তিনি কলেজের এই আচরণের তীব্র নিন্দা করে বলেন, “এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি আক্রমণ।” তিনি আরও জানান, “অনুচ্ছেদ ২৫ ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়, অনুচ্ছেদ ১৫ ধর্ম বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে, আর অনুচ্ছেদ ২১এ শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কীভাবে একজন ছাত্রীকে তার বিশ্বাস আর ভবিষ্যতের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা যায়? এটা আইনের পাশাপাশি মানবিকতারও লঙ্ঘন।”
সংগঠনটি আরও বলছে, যে মেয়েরা সংঘাতপূর্ণ কাশ্মীর থেকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে কর্ণাটকে এসেছিল, তাদের এভাবে অপমানিত হওয়া হৃদয়বিদারক। এই ঘটনা তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়ে ছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। এটি শুধু এই কয়েকজন ছাত্রীর গল্প নয়, এটি প্রতিটি সংখ্যালঘু মেয়ের কাছে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে শিক্ষার জায়গায় তার ধর্মীয় পরিচয় অগ্রহণযোগ্য। খুয়েহামি বলেন, “কর্ণাটকে শত শত কাশ্মীরি ছাত্র পড়ছে। তারা এই রাজ্যের শিক্ষাগত উৎকর্ষ ও সহনশীলতার ওপর ভরসা করে এসেছে। কিন্তু এই ঘটনা তাদের মধ্যে ভয়, বিচ্ছিন্নতা আর অনিরাপত্তা ছড়াচ্ছে।”
তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জোর দিয়ে আবেদন করেছেন যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “এই ছাত্রীদের তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত না করে শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।” তিনি শিক্ষা বিভাগ, রাজীব গান্ধী স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় ও সংখ্যালঘু কমিশনের কাছে এই ঘটনার গভীর তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এই ঘটনা কেবল কাশ্মীরি ছাত্রীদের ওপর অত্যাচার নয়, এটি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলমান বৈষম্যের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতার আদর্শ এখানে প্রশ্নের মুখে। এখন সময় এসেছে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে এই অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার। প্রত্যেকের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।


