শুক্রবার, ১৮ জুলাই, পশ্চিমবঙ্গের শিল্পশহর দুর্গাপুরে বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প সভা’য় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তিনি জোর গলায় বলেন, বাংলার মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, দুর্নীতি থেকে মুক্তি চায়, আর বিজেপির হাতে রাজ্যের ভবিষ্যৎ দেখতে চায়। আগামী বছর মার্চ-এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনে নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে মোদি এই সভায় তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে বিজেপিকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু এই জোরালো ভাষণের পরেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—বিজেপি বা তৃণমূল, কেউ কি সত্যিই বাংলার জন্য উপযুক্ত? অনেকের মনে আবার ফিরে আসছে বামফ্রন্টের শাসনকালের স্মৃতি, যখন বাংলা শান্তি আর স্থিতিশীলতার প্রতীক ছিল।
মোদির ভাষণে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তিনি বলেন, তৃণমূলের শাসনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, নারীদের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই, আর কর্মসংস্থানের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেন, এককালে বাংলায় গোটা দেশ থেকে মানুষ কাজের জন্য আসত, কিন্তু এখন বাংলার ছেলেমেয়েরা কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সেই সোনালী দিন ফিরিয়ে আনবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কিন্তু এই কথাগুলো শুনে বাংলার মানুষের মনে সন্দেহ জাগছে। বিজেপি কি সত্যিই এত বড় পরিবর্তন আনতে পারবে? তাদের শাসিত রাজ্যগুলোর দিকে তাকালে তো উল্টো ছবি দেখা যায়। উত্তরপ্রদেশে আইনশৃঙ্খলার বেহাল দশা, মধ্যপ্রদেশে নারীদের উপর অত্যাচারের ঘটনা—এসব কি বাংলার জন্য আদর্শ হতে পারে? মোদির প্রতিশ্রুতি যেন শুধুই ভোটের জন্য মিষ্টি কথা, তার পেছনে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।
তৃণমূলের শাসন নিয়েও মানুষের অভিযোগ কম নয়। গত কয়েক বছরে দুর্নীতির দাগ লেগেছে তৃণমূলের কপালে। রাজনৈতিক হিংসা আর প্রশাসনের অদক্ষতা তো আছেই। রাজ্যে শিল্পের অভাবে যুবক-যুবতীরা কাজের জন্য ভিটেমাটি ছাড়ছে। নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে তৃণমূল সরকার বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই সুযোগে বিজেপি যে ছবি আঁকছে, তা কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য? মোদি বলেন, বিজেপি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান করে। কিন্তু বাংলার মানুষের মনে পড়ে যায় বিজেপি নেতাদের সেইসব মন্তব্য, যেখানে বাঙালি পরিযায়ীদের বিজেপি শাসিত রাজ্যে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে, বাঙালিকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গাল দেওয়া হয়েছে, জোরপূর্বক বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলার সংস্কৃতি বোঝার ক্ষমতা কি সত্যিই বিজেপির আছে? নাকি এসব কেবল ক্ষমতার লোভে বলা কথা?
এই দুই দলের ঝগড়ার মাঝে অনেকেই ফিরে তাকাচ্ছেন বামফ্রন্টের শাসনকালের দিকে। বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন বাংলায় আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বর্তমানের চেয়ে অনেক ভালো ছিল। রাজনৈতিক হিংসা এতটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তখন এত অভিযোগ শোনা যেত না। শিক্ষায় উন্নতি ছিল, কৃষিতে দেশ জুড়ে নাম ছিল, শিল্পায়নে গতি ছিল, বামফ্রন্টের আমলে বাংলা একটা স্থিতিশীল রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ছিল অটুট। সাহিত্য, শিল্প, আর শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা তখন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তৃণমূলের শাসনে সেই গৌরব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি আর তৃণমূল দুই দলই জোরকদমে প্রচারে নেমে পড়েছে। মোদির সভা দিয়ে বিজেপি যে গতি পেয়েছে, তাতে তারা আত্মবিশ্বাসী। তৃণমূলও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়ছে না। কিন্তু বাংলার মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই দুই দলের মধ্যে আটকে থাকার কী দরকার? বামফ্রন্ট, যারা একসময় বাংলাকে শান্তি আর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের কি আরেকবার সুযোগ দেওয়া যায় না? তৃণমূলের দুর্নীতি আর বিজেপির ফাঁকা প্রতিশ্রুতির মাঝে বামফ্রন্টই যেন একমাত্র আলোর রেখা।
বাংলার মানুষের কাছে এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। বিজেপির মিষ্টি কথায় ভুলে যাওয়ার আগে তাদের শাসিত রাজ্যগুলোর দিকে একবার তাকানো দরকার। তৃণমূলের ব্যর্থতা স্পষ্ট হলেও, বিজেপি কি তার থেকে ভালো কিছু দিতে পারবে? নাকি বামফ্রন্টের সেই স্থিতিশীল শাসনই বাংলার জন্য সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে? অতীতের সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করে বাংলার মানুষ যদি বামফ্রন্টকে আরেকবার ভরসা করে, তাহলে হয়তো আবার সেই শান্তির দিন ফিরে আসবে।


