বুধবার সকাল। ঘড়িতে তখন প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিট। হঠাৎ করেই তীব্র বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে বারামতি বিমানবন্দর এলাকা। বিমানবন্দরের ভেতরে ও আশপাশে থাকা মানুষজন মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী ঘটেছে। বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখা যায়, একটি বিমান দাউ দাউ করে জ্বলছে। আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। খুব দ্রুতই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার যে বিমানটি করে যাচ্ছিলেন, সেটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। রাজনৈতিক মহলে নেমে আসে তীব্র শোক ও চাঞ্চল্য। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে বহু দূর পর্যন্ত তা শোনা যায়।
জানা গিয়েছে, মুম্বই থেকে বারামতিতে একটি জনসভায় যোগ দিতে যাচ্ছিলেন অজিত পাওয়ার। তিনি লিয়ারজেট-৪৫ মডেলের একটি ছোট বিমানে সফর করছিলেন। বিমানটিতে মোট পাঁচজন ছিলেন। অজিত পাওয়ার ছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী বিদীপ যাদব, দুই পাইলট সুমিত কাপুর ও শাম্ভবী পাঠক এবং ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট পিঙ্কি মালি ওই বিমানে ছিলেন। বারামতি বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ই দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিমানটি নামার সময় হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি রানওয়ের পাশের একটি এলাকায় আছড়ে পড়ে। মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একের পর এক বিস্ফোরণ হয় এবং পুরো বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনার পরে আগুন এতটাই ভয়াবহ আকার নেয় যে কেউ কাছাকাছি যেতে পারেননি। স্থানীয় মানুষজন এবং বিমানবন্দরের কর্মীরা উদ্ধারকাজের চেষ্টা করলেও তীব্র আগুনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তবে ততক্ষণে বিমানের কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরে দেহগুলি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুনে পুড়ে দেহগুলির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে কোনটা কার দেহ, তা বোঝা যাচ্ছিল না। পরে হাতঘড়ি ও পোশাকের সূত্র ধরে অজিত পাওয়ারের দেহ শনাক্ত করা হয়।
বিমানের যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার ২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি একবার অবতরণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রথমবার তা সফল হয়নি। এরপর পাইলটেরা বিমানটিকে আবার আকাশে তুলে নিয়ে যান। দ্বিতীয়বার অবতরণের চেষ্টার সময়ই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই সময় বারামতি বিমানবন্দর এলাকায় ঘন কুয়াশা ছিল। দৃশ্যমানতা কম থাকার কারণেই পাইলটদের সমস্যায় পড়তে হয় বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। বিমানমন্ত্রী কে রামমোহন নায়ডু জানান, দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। ডিজিসিএ এবং বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা এএআইবি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। মন্ত্রী জানান, প্রথমবার অবতরণের সময় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে পাইলটদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রানওয়ে দেখা যাচ্ছে কি না। দ্বিতীয়বারও একই প্রশ্ন করা হয়। পাইলটরা ইতিবাচক উত্তর দেওয়ার পরই অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু অবতরণের মুহূর্তেই বিমানটি ভেঙে পড়ে। বারামতি বিমানবন্দরের ম্যানেজার শিবাজি তাওয়াড়ে জানান, বিমানটি রানওয়ের এক ধারে ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। কেন এমন হল, তা তদন্তের পরে স্পষ্ট হবে বলে তিনি জানান।
এই দুর্ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে অস্থিরতা চলছে। বিজেপি, শিবসেনা এবং এনসিপির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল। রাজনৈতিক মহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল নানা সমীকরণের কথা। এই পরিস্থিতিতে অজিত পাওয়ারের মৃত্যু রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। যে বারামতির মাটি থেকে অজিত পাওয়ারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল, সেই বারামতিতেই তাঁর বিমানের দুর্ঘটনা রাজ্যের মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সর্বত্র শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, যে বেসরকারি সংস্থার মালিকানাধীন ছিল বিমানটি, সেই সংস্থার মালিক ভি কে সিং দাবি করেছেন, বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণে কোনও গাফিলতি ছিল না। তাঁর বক্তব্য, বিমানটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল এবং কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি পাওয়া যায়নি। পাইলটরাও ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত। তবে এই দাবির পরেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, তাহলে দুর্ঘটনার কারণ কী? কেন শেষ মুহূর্তে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করতে হয়েছিল? প্রাক্তন এয়ার ইন্ডিয়া পাইলট ও বিমান বিশেষজ্ঞ মিনো ওয়াডিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ভারতের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, দেশে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিমান সুরক্ষা বোর্ডের অভাব রয়েছে। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য এমন সংস্থা অত্যন্ত জরুরি। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর গোটা দেশ শোকস্তব্ধ। একই সঙ্গে আবারও বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে দেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। বারবার এমন ঘটনা ঘটার পরেও কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও কড়া নজরদারি করা হচ্ছে না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ। সেই সঙ্গে অজিত পাওয়ার ও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষদের মৃত্যুর পিছনের কারণ, নিছক কোনো দুর্ঘটনা না কোনো ষড়যন্ত্র তা বলবে কেবল সময়।


