সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইজরায়েল সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরের দ্বিতীয় দিন তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী-র সঙ্গে বৈঠক করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তিতে সই করেন। দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে।
২০১৭ সালে ভারত ও ইজরায়েলের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তার ভিত্তিকে আরও শক্ত করার কথা বলা হয়েছে এবার। সরকারি সূত্রের দাবি, এই নতুন চুক্তিগুলি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও কৃষি সহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াবে। তবে সমালোচকদের মতে, এই চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর। পশ্চিম এশিয়ার চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। বৈঠকের পর মোট ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই হয়। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, অসামরিক পারমাণবিক শক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দুই দেশ দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারেও একমত হয়েছে। সরকার পক্ষের মতে, এতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও বাড়বে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এই ঘনিষ্ঠতা অনেকের চোখে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ অভিযোগ তুলেছে, ইজরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে যে প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহার হচ্ছে, তার সঙ্গে ভারতের বেসরকারি সংস্থারও যোগ থাকতে পারে। বিশেষ করে হায়দরাবাদের একটি কারখানায় ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও এ বিষয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনৈতিক ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে।
নতুন চুক্তিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ইজরায়েলের কয়েকটি অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা ভবিষ্যতে ভারতে উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে বলে দাবি করা হলেও, সমালোচকরা মনে করছেন এতে ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় একটি প্রস্তাবিত বাণিজ্য করিডোর নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যা ভারতকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করবে। তবে এই করিডোরের সম্ভাব্য পথ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কারণ তা প্যালেস্তাইনের ভূখণ্ড স্পর্শ করতে পারে। প্যালেস্তাইনের নেতৃত্বকে আলোচনায় না রাখায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই সফরের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। গাজায় চলমান সংঘর্ষের কারণে ইজরায়েল বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে চাপে রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই অবস্থায় ভারতের এমন ঘনিষ্ঠতা কূটনৈতিকভাবে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’ সম্প্রতি নেতানেয়াহুর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি পদক্ষেপের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও ইজরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে সরকার পক্ষ বলছে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষাই তাদের প্রধান লক্ষ্য এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাই ভারতের নীতি। সব মিলিয়ে মোদীর এই সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।


