নিউ ফরাক্কা স্টেশনের কাছে রেললাইনে ধস। তার জেরে ব্যাহত ট্রেন চলাচল। রেলপথে দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ কার্যত বিপর্যস্ত। রেলের তরফে জানানো হয়েছে, আজকের মধ্যেই মেরামতির কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে রেললাইনে এই ধসকে শুধুমাত্র সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখতে নারাজ বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, এর নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় নদীভাঙনের সংকেত।
নিউ ফরাক্কা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ভৌগোলিক অবস্থানই তৈরি করেছে উদ্বেগ। একদিকে গঙ্গার মূল স্রোত, অন্যদিকে তার শাখা প্রবাহ পদ্মা। দুই জলধারার মধ্যবর্তী স্থলভাগের দূরত্ব বর্তমানে প্রায় দেড় কিলোমিটার বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে এই স্থলভাগ আরও ক্ষয় হতে পারে। একসময় গঙ্গা ও পদ্মার জলধারা কাছাকাছি এসে মিশে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
আর এমনটা হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বিস্তীর্ণ এলাকায়। মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান, বল্লারপুর-সহ একাধিক এলাকা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। শুধু বসতি নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে রেল ও সড়ক যোগাযোগেও। মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মধ্যে যোগাযোগ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রেললাইন আজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব। কিন্তু নদীভাঙনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলেই সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নদী বিশেষজ্ঞ কৌশিক চক্রবর্তীর দাবি, ফরাক্কা বাঁধ তৈরি এবং পরবর্তী সময়ে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের প্রভাব এই অঞ্চলের নদীর গতিপথে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে জলচুক্তির পর পরিস্থিতির পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়। তাঁর দাবি, এরপর আপস্ট্রিমে চর তৈরি এবং ডাউনস্ট্রিমে জলপ্রবাহ কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি দেখা দেয়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে নদীভাঙনও ভয়াবহ আকার নেয়।
কৌশিক চক্রবর্তীর কথায়, ভাঙনকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে, যেখানে বিস্তীর্ণ স্থলভাগ নদীর গ্রাসে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাঁর মতে, এর প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক চিত্রেও।
তাঁর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র বদলে যাওয়া মানে অর্থনীতি বদলে যাওয়া। কী ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে, তা কল্পনা করা যাচ্ছে না।”
অর্থাৎ, নিউ ফরাক্কায় রেললাইনে ধস আপাতত ট্রেন চলাচলের সমস্যা তৈরি করলেও, এর পিছনে থাকা নদীভাঙনের প্রবণতা নিয়ে এখনই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। রেললাইন মেরামত করে যোগাযোগ স্বাভাবিক করা সম্ভব হলেও, গঙ্গা-পদ্মার ভাঙন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব হতে পারে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী।


