সৌদি সিলেবাসে রামায়ণ, মহাভারত? ভুয়া খবরটির সত্যতা উন্মোচন

সাইফুল্লা লস্কর

গতকাল থেকে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে একটা সংবাদ বার বার শিরোনামে উঠে এসেছে। খবরটিতে বলা হচ্ছে, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে রামায়ণ, মহাভারত, যোগ ব্যায়াম, আয়ুর্বেদ, জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্মের মতো ভারতীয় ধর্মীয় সাংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে সৌদি আরবের বিদ্যালয় শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং নীতিনির্ধারক যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। খবরটি প্রায় সব সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ও ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয় খবরটি। শুরু হয় তর্ক বিতর্ক, যুক্তি পাল্টা যুক্তির পালা। এক শ্রেণীর মানুষ এটাকে স্বাগত জানিয়েছেন। আরেক শ্রেণী এটাকে প্রত্যাখ্যান করে সৌদি যুবরাজের সমালোচনা করেছেন। খবরটি ব্যাপকতা লাভ করার পর বিষয়টি নিয়ে সত্যতা উন্মোচনের লক্ষ্যে আমরা একটু খোঁজখবর শুরু করি। এখানে বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা সমস্ত তথ্য তুলে ধরা হল।

 

প্রথমে, খবরটির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, খবরটি প্রথম প্রকাশ করে কোনো এক ইস্ট কোস্ট ডট ইন নামক অনলাইন সংবাদমাধ্যম। তারপর ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রায় সবাই এটিকে লুফে নেয়। তবে এক্ষেত্রে অদ্ভুত এবং লক্ষনীয় বিষয় হল, খবরটি প্রচারের ক্ষেত্রে সবাই রামায়ণ, মহাভারত, যোগা, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি উল্লেখ করছেন এবং তা সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ এর অংশ তা ও অনেকে সবিস্তারে উল্লেখ করলেও সৌদি আরবের কোন সরকারি মুখপাত্র বা কোনো সরকারি উৎসের উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি এত গুরত্বপূর্ণ খবরের সপক্ষে কোনো সৌদি গণমাধ্যম বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মূলধারার গণমাধ্যমের ও বরাত দিতে দেখা যায়নি কাউকে। আর মধ্য প্রাচ্যের কোনো গণমাধ্যমে এই খবরটি প্রকাশিত ও হয়নি।

এখানে খবরের সত্যতা প্রমাণের জন্য একটি সাধারণ মহিলার করা একটি টুইট এর উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি সৌদি আরবের বন্দর নগরী জেদ্দার বাসিন্দা বলে নিজের ফেসবুক আইডিতে দাবি করেছেন। এই টুইট এ নৌফ আল মারওয়াই নামক মহিলাটি জানিয়েছেন, তার সন্তান সৌদি আরবের এক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যার পরীক্ষাতে ভারতীয় ইতিহাস এবং সংস্কৃতি থেকে কিছু প্রশ্ন এসেছে। তিনি কিছু প্রাইভেট করা গুগল ডকুমেন্টস এর স্ক্রীন শট দিয়ে দাবি করেন সেগুলো তার ছেলের পরীক্ষায় আসা প্রশ্ন। তবে এক্ষেত্রে তার সন্তান কোন বিদ্যালয়ের ছাত্র সে ব্যাপারে তিনি কিছু উল্লেখ করেননি। তবে সৌদি আরবের নব প্রজন্মকে বৈশ্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি করানোর জন্য সৌদি আরব এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

 

এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ওই মহিলার সন্তান সৌদি আরবের কোনো সরকারি সরকারী বিদ্যালয়ে পাঠরত নাকি বেসরকারি কোনো বিদ্যালয়ে পাঠরত সে ব্যাপারে ওই মহিলা কিছু বলননি। এমনকি তিনি সেই স্কুলের নামও উল্লেখ করেননি। ফেসবুক আইডি থেকে জানা যায় ওই মহিলাটি যোগ ব্যায়ামে তার অবদানের জন্য ইতিমধ্যে ভারতের পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি সৌদি আরবের প্রথম যোগাচার্য। তিনি সৌদি আরবে যোগা প্রচারের জন্য ইতিমধ্যে সৌদি যোগা এবং নওফ একাডেমির প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কভিন্দ এবং প্রধামন্ত্রীর মোদির সঙ্গে তার অনেকগুলো ছবিও তার ফেসবুক কভার ফটোতে দৃশ্যমান। অনেক টুইটার ব্যবহারকারী তাকে ভারতীয় বংশোদ্ভুত সৌদি নাগরিক বলেও মন্তব্য করেছেন।

অন্যদিকে টুইটারে ওই মহিলার টুইটের জবাবে সৌদি আরবের বহু স্কলার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সৌদি আরবের সরকারি বিদ্যালয় গুলির সিলেবাসে রামায়ণ মহাভারতের সংযুক্তির কথা অস্বীকার করে টুইট এবং রিটুইট করেছেন। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ এর সঙ্গে সংযুক্ত এক ইসলামিক স্কলার, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ এবং মিলি ক্রনিক্যাল এর সম্পাদক জাহাক তানভীর বলেন, যে বিদ্যালয়ের কথা বলা হচ্ছে এখানে সেটি কোনো সরকারি বিদ্যালয় নয়, এটি ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল যেটা একটি ভারতীয়দের অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয়। তিনি ভিশন ২০৩০ এর ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, ভিশন ২০৩০ এ এখনও পর্যন্ত এই ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। তবে তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে সৌদি আরবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভারতীয় ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে তাদের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সেটি আশ্চর্যজনক কিছু হবে না। কারণ ইসলামের বার্তা সবার কাছে পৌঁছানোর জন্য অন্যধর্মের ব্যাপারে আমাদের আরো বিস্তারিত ভাবে জানা দরকার। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ইসলামী শিক্ষা বিষয়ে পাঠদান দান করা হয়।

 

সুতরাং, অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য মতে বর্তমানে সৌদি আরবের সিলেবাসে ভিশন ২০৩০ অনুসারে রামায়ণ, মহাভারত, আয়ুর্বেদ এবং যোগ ব্যায়াম প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। খবরটি এই বিশেষ সময়ে যখন দেশে করোনা সংক্রমনের ধাক্কায় বেসামাল মোদি সমালোচনার কেন্দ্রে আছেন ঠিক সেই সময়ে এইভাবে এমন খবর প্রচারের কারণ খুঁজতে হলে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা মহিলাটির পরিচয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *