কলকাতার কাঁকুড়গাছির একটি বস্তিকে ঘিরে হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার আবহ। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করা বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনও স্পষ্ট কারণ না জানিয়ে এবং পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়েই এই নাম কাটার ঘটনা ঘটেছে, যা তাঁদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
এই বস্তিতে প্রায় ১৭০ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে বহু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম বহু বছর ধরেই ভোটার তালিকায় ছিল এবং তাঁরা নিয়মিত ভোটও দিয়েছেন। ফলে হঠাৎ করে নিজেদের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় তাঁরা এখন চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগছে—তাহলে কি তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়েই সন্দেহ তৈরি করা হচ্ছে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায় উঠে এসেছে সেই হতাশা আর ক্ষোভের চিত্র। কারও পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম বাদ পড়েছে, কেউ আবার বহু পুরনো নথি থাকা সত্ত্বেও তালিকায় জায়গা পাননি। কেউ বলছেন, জন্ম থেকে এখানেই বড় হয়েছেন, তবুও আজ প্রমাণ দিতে হচ্ছে তাঁরা এই দেশের নাগরিক। আবার কারও প্রশ্ন, এত বছর ভোট দেওয়ার পর হঠাৎ করেই কেন তাঁদের নাম মুছে দেওয়া হল?
সমস্যা আরও জটিল হয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাঁদের কাছে আধার, রেশন কার্ড, বিদ্যুৎ বিলের মতো নথি থাকলেও এখন নতুন করে জন্মসনদ বা স্কুলের সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে। অনেকেই আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় এসব জোগাড় করা তাঁদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তাঁরা আরও বিপাকে পড়ছেন।
এর পাশাপাশি এলাকায় ছড়িয়েছে ভয় আর গুজবও। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, কিছু ব্যক্তি এসে টাকার বিনিময়ে নাম ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে।
এই কঠিন সময়েও মানবিকতার কিছু ছবি সামনে এসেছে। এক প্রবীণ মহিলা দেশাত্মবোধক গান গেয়ে শোনান, যা উপস্থিত সকলকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। তাঁর কথায় ফুটে ওঠে দেশের প্রতি ভালোবাসা, আর সেই সঙ্গে বেদনাও—যে দেশে তিনি জন্মেছেন, সেই দেশেই আজ নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী মানুষদের এভাবে হঠাৎ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলে তাঁদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। ইতিমধ্যেই আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
বর্তমানে গোটা এলাকা জুড়ে একটাই দাবি উঠেছে—এই প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং যাঁদের নাম বাদ গেছে, তাঁদের দ্রুত তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।


