গত দু’বছরে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বরফ অনেকটাই গলেছে। কিছু সমস্যা ও মতপার্থক্য এখনও রয়েছে। তবে সেই মতপার্থক্য যেন কখনও বিবাদে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে একমত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শনিবার দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠকে উঠে এল পারস্পরিক সহযোগিতা, কৌশলগত সম্পর্ক এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার প্রসঙ্গ।
গলওয়ান সংঘাতের পর এই প্রথম ভারত সফরে এলেন শি জিনপিং। ফলে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি মোদী-শি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের দিকেও নজর ছিল আন্তর্জাতিক মহলের। সাম্প্রতিক সময়ে চিনের তরফে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈঠকের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। শনিবারের বৈঠকে ফের ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বার্তা দেন চিনা প্রেসিডেন্ট।
একে অপরের ক্ষমতা ও সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে ভারত ও চিনকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন শি জিনপিং। ব্রিকসের সার্বিক বিকাশের জন্যও দিল্লি ও বেজিংয়ের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
দুই রাষ্ট্রনেতাই ভারত-চিনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে গেলে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি—বৈঠকে শি-কে তা স্পষ্ট করে দেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
গলওয়ান সংঘাতের পর এই নিয়ে তৃতীয় বার মুখোমুখি হলেন মোদী ও শি। ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে, ২০২৫ সালে চিনের তিয়ানজিনে এবং এ বার দিল্লিতে তাঁদের বৈঠক হয়েছে। গলওয়ান সংঘাতের জেরে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। গত তিনটি বৈঠকে সেই সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ দেখা গিয়েছে উভয় দেশের তরফেই।
দু’বছর আগে কাজানের বৈঠকে মোদী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, ভারত-চিন সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং সংবেদনশীলতা। দিল্লির বৈঠকেও সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে উভয় দেশকেই পারস্পরিক স্বার্থ, শ্রদ্ধা এবং সংবেদনশীলতার উপর জোর দিতে হবে।
আমেরিকা-চিন শুল্ক সংঘাতের সময় থেকেই দিল্লির সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতায় আরও বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে বেজিং। এশিয়ার দুই শক্তিধর দেশ ভারত ও চিনের ক্ষমতা বোঝাতে বিভিন্ন সময়ে ‘হাতি’ ও ‘ড্রাগন’-এর উপমা ব্যবহার করেছে চিনা নেতৃত্ব।
বেজিংয়ের বক্তব্য, ‘ড্রাগন’ ও ‘হাতি’র মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে পাঠানো একটি চিঠিতেও চিনের তরফে ‘ড্রাগন-হাতি’ নাচের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে দুই দেশের মানুষের স্বার্থে ভারত ও চিনের একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
এ বার মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও কৌশলগত সাফল্য এবং যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন শি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন মোদীও। তবে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার গুরুত্বও স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকসের অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলনে ১১টি দেশের জোট সর্বসম্মতিক্রমে যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে। সেখানে কোনও দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে একতরফা শুল্কনীতির সমালোচনা করা হয়েছে। গত এক বছরে বিভিন্ন দেশের উপর আমেরিকার একতরফা শুল্ক আরোপের নীতির প্রেক্ষিতেই এই বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।
একই ভাবে, একটি দেশের উপর অন্য দেশের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর বিরোধিতা করেছে ব্রিকস। ঘোষণাপত্রে কোনও দেশের নাম উল্লেখ করা না হলেও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারির প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিকসের বক্তব্য, এই ধরনের একতরফা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট দেশগুলির উন্নয়ন, খাদ্যসুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনৈতিক মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে ব্রিকসের যৌথ ঘোষণাপত্রে। পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে আলাদা করে কোনও উল্লেখ নেই।
গত বছরের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলারও নিন্দা জানিয়েছে ব্রিকস। ভারত শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, পাকিস্তান থেকে আসা জঙ্গিরাই ওই হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। চিনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে যৌথ ঘোষণাপত্রে পহেলগাঁও হামলার নিন্দা এবং তাতে শি জিনপিংয়ের স্বাক্ষরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গাজা ভূখণ্ডের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিকস। রাষ্ট্রপুঞ্জে প্যালেস্টাইনের পূর্ণ সদস্যপদের দাবির প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এই গোষ্ঠী।
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে ভারত। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিও জানিয়ে আসছে নয়াদিল্লি।
দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে ফের সেই দাবি স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে আর দেরি করা চলবে না।
ব্রিকসের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, গত দুই দশকে আন্তর্জাতিক এই গোষ্ঠী যথেষ্ট সফল হয়েছে এবং বিশ্বমঞ্চে স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছে। আগামী দিনে ব্রিকস আরও বিকশিত হবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।
সম্মেলনে মোদী বলেন, “আজ ব্রিকস আরও পরিণত হওয়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা কারও বিরুদ্ধে নই। বরং, আমরা সকলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।”


