চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল রাজস্থানের ২১ বছরের তরুণ প্রদীপ মাহিচের। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে তিনি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট)-এর জন্য। আগের দু’বার ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৬ সালের পরীক্ষাকে তিনি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল এবং পুনরায় পরীক্ষার সিদ্ধান্ত তাঁর সেই স্বপ্নকে ধাক্কা দেয়। পরিবারের দাবি, সেই মানসিক আঘাতই শেষ পর্যন্ত প্রাণ কেড়ে নেয় তরুণের।
প্রদীপ একা নন। একই ঘটনায় আকাঙ্ক্ষা নামে আরও এক পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, নতুন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এই ঘটনাগুলি ফের একবার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত রাখা কি এতটাই কঠিন?
৩ মে অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিট ইউজি ২০২৬। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে হয় কর্তৃপক্ষকে। তদন্তে উঠে আসে, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং কেরল জুড়ে সক্রিয় একটি চক্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ। ডাক্তারি পড়ুয়া, কোচিং অপারেটর, দালাল এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত ওই নেটওয়ার্ক সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেয় বলে তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক অনুমান।
তবে এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও নিট পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তারও আগে ২০১৫ সালে অল ইন্ডিয়া প্রি-মেডিক্যাল টেস্ট (AIPMT)-এ প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সামনে আসার পর গোটা পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নিতে হয়েছিল।
দেশে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১২ সালে রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম বড় আকারে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে জানা যায়, পরীক্ষার আগে লক্ষাধিক টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হয়েছিল। পরে সিবিআই এবং বিশেষ তদন্তকারী দল একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে।
২০১৪ সালে ফের রেলের গ্রুপ-ডি নিয়োগ পরীক্ষাতেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। তদন্তে উঠে আসে, কয়েকটি রাজ্যে সক্রিয় চক্র ছাপাখানা থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল।
২০১৭ সালে এসএসসি কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (সিজিএল) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও উত্তরসূচির ছবি সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষার্থীদের কম্পিউটার সিস্টেমে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে উত্তর পরিবর্তনের মতো কারচুপিও হয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব যায় সিবিআইয়ের হাতে এবং আদালতের নির্দেশে পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করা হয়।
২০১৮ সালে সিবিএসই-র দশম শ্রেণির গণিত এবং দ্বাদশ শ্রেণির অর্থনীতি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তদন্তে নেমে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ একাধিক সূত্র খুঁজে পায়। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগুলি পুনরায় আয়োজন করতে হয়।
প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠলেই সামনে আসে মধ্যপ্রদেশের বহুল আলোচিত ব্যাপম (Vyapam) কেলেঙ্কারির নাম। সরকারি চাকরি, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় জালিয়াতি, ভুয়ো পরীক্ষার্থী, ওএমআর শিটে কারচুপি এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশ্যে আসা এই কেলেঙ্কারির শিকড় কয়েক দশক পুরোনো বলে তদন্তে উঠে আসে।
বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা প্রশ্নফাঁস, কারচুপি বা নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, শিক্ষক নিয়োগ, পুলিশ নিয়োগ এবং উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষা।
মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, অসম, তেলঙ্গানা এবং ওড়িশার মতো রাজ্যে বারবার এই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে, আবার কোথাও নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী। প্রশ্নফাঁস বা কারচুপির ঘটনা সামনে এলে শুধু পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই নয়, ভেঙে পড়ে পরীক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তাও। বহু পরীক্ষার্থী হতাশা, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তির যুগে প্রশ্নপত্র সুরক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল নজরদারি আরও শক্তিশালী করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিবারই কয়েকজনের অসাধু চক্রের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন লক্ষ লক্ষ পরিশ্রমী পরীক্ষার্থী। প্রশ্ন একটাই— যারা বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে, তাদের পরিশ্রমের মূল্য কি কখনও পুরোপুরি রক্ষা করতে পারবে দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা?

