সিকিমের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয়েছিল পাকিয়ং বিমানবন্দরের। কিন্তু উদ্বোধনের আট বছর পরেও ছবিটা কার্যত হতাশাজনক। বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এই বিমানবন্দরে বর্তমানে কোনও নির্ধারিত বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা চালু নেই। একদিকে পরিকাঠামোগত সমস্যা, অন্যদিকে বারবার পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পুনরুদ্ধারের কাজে দীর্ঘসূত্রিতা—সব মিলিয়ে পাকিয়ং বিমানবন্দর এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে Comptroller and Auditor General (CAG)-এর ২০২৩ সালের রিপোর্টে উঠে আসা একাধিক অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতির তথ্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
২০০৮ সালের অক্টোবরে পাকিয়ং বিমানবন্দর প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয় ৩০৯.৪৬ কোটি টাকা এবং ২০১২ সালের জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫৩.৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু CAG-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত বিমানবন্দর নির্মাণে মোট খরচ হয়েছিল ৭০৮.৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রের অনুদান ছিল ৪৪৮.০৯ কোটি টাকা এবং Regional Connectivity Scheme-এর আওতায় Airports Authority of India (AAI) পেয়েছিল ১৬৪.৩৮ কোটি টাকা।
২০১৮ সালের মে মাসে বিমানবন্দরটিকে বাণিজ্যিক পরিষেবার জন্য প্রস্তুত ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হয় বাণিজ্যিক বিমান চলাচল। কিন্তু নির্মাণকাজের গুণমান ও পরিকল্পনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
CAG রিপোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল বিমানবন্দরের পাহাড়ি ঢালের নকশা নিয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে ২৮ ডিগ্রি কোণের সুপারিশ করেছিলেন। পরবর্তীতে AAI নিযুক্ত সংস্থা Mott MacDonald ৩৬ ডিগ্রি কোণের সুপারিশ করে। কোনও বিস্তারিত তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই AAI সেই সুপারিশ মেনে কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CBRI) জানায়, ৩৬ ডিগ্রির নকশাটি সঠিক ছিল না।
এরপরই আশপাশের বাড়িতে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিবাদ এবং নির্মাণকাজে বাধার মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বাবদ AAI-কে দিতে হয় ৮৪.৬৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি খরচ বৃদ্ধি ও ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান বাবদ ৭৭.৩৫ কোটি টাকা এবং পাহাড়ি ঢাল সংক্রান্ত অতিরিক্ত কাজ ও জমি অধিগ্রহণে আরও ১৫২.৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩১৪.৫৩ কোটি টাকাকে এড়ানো সম্ভব ছিল এমন অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করে CAG।
ঠিকাদার সংস্থা Punj Lloyd Ltd-কে ঘিরেও উঠে আসে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। আগের বিলগুলি থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ কেটে রাখতে ব্যর্থ হয় AAI। CAG-এর হিসাব অনুযায়ী, সংস্থার কাছ থেকে ২৫.৯২ কোটি টাকা আদায় করা বাকি ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকাদার সংস্থাটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় সেই অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা কার্যত ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৭.৯৫ কোটি টাকা ঝুঁকির মুখে ছিল, যদিও সালিশি প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারকে দেওয়া ১৭.৯৭ কোটি টাকা AAI-র কাছে ছিল।
শুধু নির্মাণ নয়, বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক পরিচালনাও শুরু থেকেই সমস্যার মুখে পড়ে। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত প্রথম আট মাসে মোট ২৩১ দিনের মধ্যে মাত্র ১২৫ দিন বিমান চালিয়েছিল SpiceJet। ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পরিষেবা বন্ধ থাকে। পরে অনিয়মিতভাবে বিমান চলাচল শুরু হলেও ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফের পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। CAG জানায়, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোটামুটি ৩০ মাস বিমান চলাচল সম্ভব হয়েছিল।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও আবহাওয়া সংক্রান্ত সমীক্ষা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে অডিট রিপোর্ট। ২০০৪ সালে DGCA-র নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় Aeronautical Study সম্পূর্ণ করেনি AAI। ২০১৮ সালের জুনে ICAO-র মাধ্যমে সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং তার ফলাফল আসে ২০১৯ সালের এপ্রিলে, অর্থাৎ বাণিজ্যিক বিমান চলাচল শুরুর পর। সেই সমীক্ষায় বিমানবন্দরের Transitional Surface-এ বাধা সংক্রান্ত Class-I Hazard চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি, পাকিয়ং থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্যাংটকের আবহাওয়ার তথ্যের উপর নির্ভর করে বিমানবন্দরের Detailed Project Report তৈরি করা হয়েছিল বলেও আপত্তি জানায় CAG।
২০২৪ সালের জুনে ফের বন্ধ হয়ে যায় নির্ধারিত বিমান পরিষেবা। ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ লোকসভায় লিখিত জবাবে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক জানায়, পাকিয়ং-দিল্লি রুটে SpiceJet-এর শেষ বিমান চলেছিল ৮ জুন ২০২৪ এবং পাকিয়ং-কলকাতা রুটে শেষ বিমান চলেছিল ৯ জুন ২০২৪। প্রতিকূল আবহাওয়াকেই পরিষেবা বন্ধের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রক।
২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত UDAN প্রকল্পের আওতায় বন্ধ থাকা ১৫টি বিমানবন্দরের তালিকায় পাকিয়ংয়ের নামও ছিল। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাজ্যসভার সাংসদ Dorjee Tshering Lepcha-র প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রক জানিয়েছিল, নতুন নির্ধারিত বিমান পরিষেবা চালুর জন্য AAI-র কাছে কোনও স্লটের আবেদন বিচারাধীন নেই।
পাকিয়ং বিমানবন্দরে বিমান পরিষেবা পুনরায় চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সরব লোকসভার সাংসদ Indra Hang Subba। সংসদে একাধিকবার বিষয়টি উত্থাপন করার পাশাপাশি অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক ও AAI-র কাছে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের অগস্টে তাঁর উদ্যোগে একটি বৈঠকে বিমান সংস্থার প্রতিনিধি, সরকারি আধিকারিক এবং মন্ত্রকের কর্তারা অংশ নেন। সেখানে বছরভর বিমান পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা ও বিমানবন্দরের পরিকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাংসদের আরও একটি আবেদনের পর অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী জানান, UDAN 5.3 প্রকল্পের আওতায় পাকিয়ং-গুয়াহাটি রুটটি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ন’আসনের বিমান পরিষেবার জন্য Jet Wings-কে Letter of Intent (LOI) দেওয়া হয়েছে। তবে LOI জারি হওয়া মানেই যে পরিষেবা চালুর চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা হয়েছে, তা নয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে বিমানবন্দরের পুনরুদ্ধার ও যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবা ফের চালুর বিষয়টি পর্যালোচনা করতে Airport Advisory Committee-র বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন Indra Hang Subba। জুলাই মাসেও কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী এবং AAI-র চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে পাহাড়ি ঢালের স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরির কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তিনি। পাহাড়ি ঢালের সমস্যার প্রভাব পড়েছে NH-717A-র উপরেও।
এরই মধ্যে পাকিয়ং বিমানবন্দরের পুনরুদ্ধারের জন্য আরও ৩২৩.২৬ কোটি টাকার একটি পৃথক প্রকল্প সামনে এসেছে। পরিসংখ্যান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন মন্ত্রকের ২০২৬ সালের মার্চের প্রকল্প পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, AAI-র এই প্রকল্পে রানওয়ের Basic Strip সম্প্রসারণ, পাহাড়ি ঢালের স্থায়ী স্থিতিশীলতা এবং Storm Water Drainage ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। রিপোর্টে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩২৩.২৬ কোটি টাকা, সঞ্চিত খরচ ৮০.৮৪ কোটি টাকা এবং বাস্তব অগ্রগতি ৩৩.৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কাজ শেষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০২৬ সালের জুন। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পুনরুদ্ধারের কাজ কতদূর এগিয়েছে? কবে ফিরবে পাকিয়ং থেকে নির্ধারিত বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা? CAG-এর সুপারিশগুলির কী হয়েছে? ৩১৪.৫৩ কোটি টাকার এড়ানো সম্ভব ছিল এমন অতিরিক্ত ব্যয় এবং ২৫.৯২ কোটি টাকা আদায় না হওয়ার ঘটনায় কারও দায় নির্ধারণ করা হয়েছে কি?
অন্যদিকে, বিমানবন্দরের নিম্নাংশের Retaining Wall-সহ পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা এখনও উদ্বেগের কারণ বলে জানা যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে এই বিমানবন্দর। লোকসভা ও রাজ্যসভায় একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে AAI-র তরফে সিকিমের সদাম বা রাঙ্কার মতো বিকল্প এলাকায় নতুন বিমানবন্দর তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পাকিয়ং বিমানবন্দরে যখন ইতিমধ্যেই কয়েকশো কোটি টাকা খরচ হয়েছে, তখন কেন নতুন করে বিকল্প বিমানবন্দরের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন হচ্ছে?
পাকিয়ং বিমানবন্দর তৈরি হয়েছিল সিকিমের মানুষের বিমান যোগাযোগের সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে। কিন্তু বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরেও যদি বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন অচল থাকে, তাহলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু আশ্বাস বা সাময়িক প্রস্তাব নয়, সিকিমের মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ পরিকাঠামো, স্বচ্ছ হিসাব এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিমান পরিষেবা পুনরায় চালুর বাস্তব পরিকল্পনা।

