ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ ঘিরে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে সিপিএম। বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, শুরু থেকেই তারা যে অনিয়মের অভিযোগ তুলছিল, আদালতের নির্দেশে তারই প্রতিফলন দেখা গেল। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, ট্রাইবুনালের অনুমোদন পাওয়া আবেদনকারীদের নাম ভোটের ঠিক দু’দিন আগে তালিকায় যুক্ত করতে হবে। সেই অনুযায়ী ২৩ এপ্রিল যেসব কেন্দ্রে ভোট রয়েছে, সেখানে ২১ এপ্রিলের মধ্যে এবং ২৯ এপ্রিলের ভোটের ক্ষেত্রে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। ফলে শেষ মুহূর্তে বহু বাদ পড়া ভোটারের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, যাদের আবেদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তি হবে না, তারা এবারের ভোটে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে সব আবেদনকারীর জন্য দরজা খোলা থাকছে না। এই সীমাবদ্ধতা থাকলেও সিপিএমের মতে, এই নির্দেশ সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার পথে বড় পদক্ষেপ। এই মামলায় জানা গিয়েছে, রাজ্যের ১৮টি ট্রাইবুনালে মোট প্রায় ৩৪ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ধাপে ধাপে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়। তার মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ নামকে ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধীরা।
সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারার প্রয়োগ করে এই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই ধারার মাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। এর আগেও একই ধারার ভিত্তিতে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন ঘোষণার পর প্রশাসনিক আধিকারিকদের বদলি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই সংক্রান্ত আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে আদালত। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে সুপ্রিম কোর্ট এবং এই বদলিকে নিয়মমাফিক বলেই জানায়।
অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা এলাকার বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সি এক সাধারণ গৃহবধূ মোস্তারি বানু। তিনিই প্রথম এই বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তিনি সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিকরা অকারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মোস্তারি বানু জানিয়েছেন, বিভিন্ন ছোটখাটো কারণে যেমন নামের বানান, পারিবারিক তথ্য বা অন্য অসঙ্গতি মানুষকে নোটিস পাঠানো হচ্ছে। ফলে অনেক শ্রমিককে কাজ ছেড়ে বারবার বাড়ি ফিরতে হচ্ছে, যা তাঁদের জন্য বড় সমস্যার সৃষ্টি করছে। এই কারণেই তিনি আইনি লড়াইয়ে নামেন।
৪ঠা ফেব্রুয়ারি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদল আইনজীবী নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হন। তবে এর মাঝেই সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেন, এসআইআর-এর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করেছিলেন মুর্শিদাবাদের এক গৃহবধূ, মোস্তারি বানু। তিনি জানান, গত নভেম্বরেই ওই আবেদন জমা পড়েছিল।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন আগে জানিয়েছিল যে মনোনয়ন জমার শেষ দিন অর্থাৎ ৬ এপ্রিলেই ভোটার তালিকা স্থির করা হয়েছে। কিন্তু পরে আদালতের নির্দেশে ভোটের দু’দিন আগে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা বলা হওয়ায় কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তালিকার কপি না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছিল সিপিএম। এই রায়কে হাতিয়ার করেই সিপিএম বলছে—ভোটার তালিকা নিয়ে যে অনিয়মের অভিযোগ তারা তুলেছিল, তা অমূলক ছিল না। আদালতের এই নির্দেশ তাদের আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলেই মনে করছে বাম শিবির।


