Friday, March 6, 2026
26.7 C
Kolkata

বিহারের নিবিড় সংশোধন (SIR): ঘুরে পথে NRC লাঘু করার চেষ্টা

বিহারে ভারতের নির্বাচন কমিশনের চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি ভাষ্যমতে, এটি ভোটার তালিকাকে পরিচ্ছন্ন ও আপডেট করার একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক রেজিস্টার (NRC)-র ছায়া দেখা যাচ্ছে। আসামে NRC-এর ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম, দলিত, নারী ও দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ নাগরিকত্বহীনতার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। বিহারের SIR-ও সেই একই পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে।

কী এই SIR এবং কেন এত ভয়ঙ্কর?

এই প্রক্রিয়ার আকার ও উদ্দেশ্য সত্যিই উদ্বেগজনক। ১৯৮৭ সালের পরে জন্মগ্রহণকারী এবং ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ৪.৭৬ কোটিরও বেশি মানুষকে এখন তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের এমন কিছু নথি জমা দিতে হবে। যারা তরুণ, ভূমিহীন, অভিবাসী বা নিরক্ষর—তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া একটি দুঃস্বপ্ন। এই মানুষদের কাছে প্রায়ই কোনো নথি থাকে না, আর তাই তারা ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এটি সংবিধানের মূল নীতির উল্টো পথে চলছে—যে নীতি বলে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার আছে, যতক্ষণ না অন্যথা প্রমাণিত হয়। কিন্তু এখন সেই প্রমাণের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের অপমান ও বৈষম্যের ছায়া

এই প্রক্রিয়া সংবিধানের ১৪, ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। সমতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার এখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধার কার্ড—যা সরকারি কাজে বাধ্যতামূলক— তা এখানে গ্রহণযোগ্যই নয়। তার বদলে স্কুল সার্টিফিকেট, জমির দলিল বা পৈতৃক জন্মের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। এটি উচ্চবর্ণ, সম্পত্তিশালী ও নথি-সমৃদ্ধদের পক্ষে কাজ করছে, আর ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক মানুষদের শাস্তি দিচ্ছে। আজকের গণতান্ত্রিক ভারতে এমন পশ্চাদগামী যুক্তি সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূল ধারণাকেই অস্বীকার করে।

সংক্ষিপ্ত সময়সীমা

SIR-এর সময়সীমা এতটাই সংক্ষিপ্ত যে এত বড় সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে নথি সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। সাধারণ মানুষকে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ঠিকমতো জানানো হয়নি। অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়, বরং নির্বাচনী ও বিশৃঙ্খল বলে মনে হচ্ছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা সঠিক নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ করছেন। ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, ভয় ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে—বিশেষ করে দলিত, মুসলিম ও নারীদের মধ্যে।

বিহারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

এই প্রক্রিয়া শুধু বিহারেই থেমে থাকবে না। আগামী বছরগুলোতে অন্যান্য রাজ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি একটি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারে, যা দেশজুড়ে ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে। অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর এখনই সজাগ হওয়া দরকার। তারা যদি রাজ্য পর্যায়ে আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা না গড়ে তোলে, তাহলে তারাও এই ফাঁদে পড়তে পারে।

মানুষের প্রতিরোধ ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা

বিহারের মানুষ এখন আর চুপ করে নেই। পাটনায় ইমারত-ই-শরিয়াহ আয়োজিত একটি সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। যদিও সেই সমাবেশটি ওয়াকফ আইনের বিরোধিতায় ছিল, SIR-এর মতো গুরুতর বিষয়েও একই রকম জনপ্রতিক্রিয়া দরকার। সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ এখন মানুষকে সচেতন করছে, আইনি সাহায্য দিচ্ছে এবং প্রতিবাদের পথে নামছে। কিন্তু এই লড়াই আরও বড় আকারে ছড়িয়ে দিতে হবে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ উঠেছে। তারা কেন এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে? এর পিছনে কী রাজনৈতিক পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে? এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি সরাসরি হুমকি। সরকারের কাজ মানুষের অধিকার রক্ষা করা, তাদের হরণ করা নয়। কিন্তু এখানে ঠিক উল্টোটা ঘটছে।

কী করা উচিত?

এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মানুষকে একত্রিত হতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে, শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি জন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে হবে। এটি শুধু বিহারের লড়াই নয়, এটি গোটা দেশের গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই।

Hot this week

রমযান ও যাকাত: আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা

রমযান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সময়।...

ইরান সংঘাত চলাকালীনই তীব্র হচ্ছে আফগানিস্তান-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, বাড়ছে উদ্বেগ!

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে আফগানিস্তান ও...

রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা হাসপাতালগুলিতে ফের কাউন্সেলিং ছাড়া নিয়োগে বাড়ছে ক্ষোভ

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক মহলে...

খামেইনির শাহাদাতের পর ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে, বাড়ছে আন্তর্জাতিক কৌতূহল

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়ছে নতুন করে উত্তেজনা। ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র...

নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফরকে দেশের কূটনৈতিক বিপর্যয় মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র...

Topics

রমযান ও যাকাত: আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা

রমযান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সময়।...

রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা হাসপাতালগুলিতে ফের কাউন্সেলিং ছাড়া নিয়োগে বাড়ছে ক্ষোভ

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক মহলে...

খামেইনির শাহাদাতের পর ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে, বাড়ছে আন্তর্জাতিক কৌতূহল

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়ছে নতুন করে উত্তেজনা। ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র...

নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফরকে দেশের কূটনৈতিক বিপর্যয় মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র...

আরামবাগে বহু সংখ্যালঘু ভোটারের নাম এখনও বিচারাধীন তালিকায়, বাড়ছে দুশ্চিন্তা

হুগলির আরামবাগে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই অনেক...

Related Articles

Popular Categories