ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার শিরোনাম— ‘মোস্তারি বানু বনাম নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর কর্মসূচিকে ঘিরে এই মামলা এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। এই মামলায় একদিকে যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে আদালতে হাজির হয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, তেমনই আড়ালে থেকে গিয়েছে এক সাধারণ গৃহবধূর অসাধারণ লড়াইয়ের গল্প।
মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা ৪৪ বছরের মোস্তারি বানুই প্রথম এই আইনি লড়াই শুরু করেন। যখন কলকাতা ও দিল্লির রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক চলছিল, তখন নিঃশব্দে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। নির্বাচন কমিশন ভোটার তথ্য সংগ্রহের ফর্মে পাসপোর্ট সাইজ ছবি বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেয়। এই নিয়মের বিরুদ্ধেই তিনি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মামলা করেন।
মোস্তারি বলেন, ধর্মীয় কারণে অনেক মুসলিম মহিলা মাথা ও কপাল ঢেকে রাখেন। বলপূর্বক ছবি তোলার বাধ্যবাধকতা তাদের অস্বস্তিতে ফেলে। তার কথায়, “ভোটাধিকার আর ধর্মীয় বিশ্বাস, এই দুইয়ের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়।” আশ্চর্যের বিষয়, তার মামলার প্রথম শুনানির আগেই নির্বাচন কমিশন হঠাৎ জানায়, ছবি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। এতে অনেকেই মনে করেন, তার আবেদনই কমিশনকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে।
কিন্তু সমস্যা সেখানেই থামেনি। ২০০২ সাল থেকে ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বরে মোস্তারি একটি নোটিশ পান। সেখানে তার বয়স ও তার বাবার বয়সের তথ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ তোলা হয়। শুধু তিনি নন, মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ একই ধরনের নোটিশ পেয়েছেন।
মোস্তারির দাবি, বহু বছর ধরে ভোট দেওয়া মানুষদেরও অকারণে হয়রানি করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় এই ঘটনা বেশি। এর ফলে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। কাজের জন্য ভিনরাজ্যে থাকা মানুষদের বারবার বাড়ি ফিরতে হচ্ছে শুনানির জন্য। এতে তাদের রোজগার ও সংসার দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষিত হয়েও জীবনে একাধিক বাধার মুখে পড়েছেন মোস্তারি। ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও বি.এড পাশ করেও শিক্ষক নিয়োগে সুযোগ পাননি। তবু থেমে যাননি। স্বামী কামাল হোসেন স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সাধারণ জীবনযাপন করলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তিনি দৃঢ়।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে জন্মতারিখের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে নথি জমা দেওয়ারও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে বহু সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেয়েছেন। ৯ ফেব্রুয়ারি মোস্তারি নিজে দিল্লিতে গিয়ে আদালতে হাজির হন। রাজনীতির বড় নামদের পাশে থেকেও তিনি রয়ে গেছেন একজন সাধারণ নাগরিক হয়ে। কিন্তু তার লড়াই আজ হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


