পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্য ঘিরে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি কলকাতায় বিশেষ ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের ধর্না কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি কিছু মন্তব্য করেন, যা নিয়ে বিরোধী দল, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এই এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিঃশব্দে কারচুপি করার চেষ্টা চলছে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি চালুর পথ তৈরি করা হচ্ছে। এই অভিযোগ তুলে কলকাতায় ধর্না কর্মসূচিতে অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী।
সেই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “অনেকে বলছেন মুসলিমদের আমরা এখানে এনে বসিয়েছি। যদি কেউ এনে থাকে, তাহলে স্বাধীনতার সময়কার নেতাদের প্রশ্ন করুন—গান্ধীজি, জওহরলাল নেহরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ বা বি আর আম্বেদকরকে জিজ্ঞেস করুন। তখন তো আপনারা জন্মই নেননি।”
এরপর তিনি বাংলায় বলেন, “আমরা আছি বলেই সবাই ভালোভাবে থাকতে পারছেন। যদি কখনও আমরা না থাকি, তাহলে এক সেকেন্ডও লাগবে না—একটা সম্প্রদায় যদি এক হয়ে যায়, চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই শেষ করে দিতে পারে।” সমালোচকদের দাবি, তার বক্তব্যে রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়কে বহিরাগত হিসেবে দেখানোর ইঙ্গিত মিলেছে। এতে বিজেপির প্রচার করা ‘অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্বই পরোক্ষে জোর পেতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের আশঙ্কা।
মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলির দাবি, এই ধরনের মন্তব্য রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। কংগ্রেস ও বাম নেতৃত্বও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছে। প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরীর দাবি, এই ধরনের মন্তব্য সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে। তার কথায়, “মুখ্যমন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা অত্যন্ত আপত্তিকর এবং নিন্দনীয়। এতে মনে হচ্ছে তিনি বিভেদের রাজনীতি করছেন।” সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তীও বলেন, ভোটের আগে মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এমন মন্তব্য করা হচ্ছে। তার মতে, “এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য রাজ্যের সামাজিক পরিবেশের জন্য ভালো নয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ ক্রমশ বাড়ছে। বিজেপির হিন্দুত্ব রাজনীতির মোকাবিলায় তৃণমূলও ধর্মীয় প্রতীক ও প্রকল্পকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তাদের মত। সমাজের অনেক মানুষের উদ্বেগ, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের এমন মন্তব্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসা পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের বিতর্ক নতুন করে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।


