‘বন্দে মাতরম’ গান গাওয়া নিয়ে নতুন আইনি বিতর্ক পৌঁছল সুপ্রিম কোর্টে। ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে করা মামলায় মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য জানতে চাইল শীর্ষ আদালত। কর্ণাটকী সঙ্গীতশিল্পী টিএম কৃষ্ণ এই মামলা করেছেন। তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্রকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলেছে আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা-র বেঞ্চ মামলাটি শুনছে। শুনানির সময় বিচারপতি বাগচী ১৯৮৬ সালের ‘বিজো ইমানুয়েল’ মামলার রায়ের কথা মনে করিয়ে দেন। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, কেউ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের কারণে জাতীয় সঙ্গীত না গাইলেও, যদি তিনি সম্মান দেখান, শুধু সেই কারণে তাঁকে শাস্তি দেওয়া যায় না। এই পুরনো রায় এখনও কার্যকর রয়েছে বলেই মন্তব্য করেন বিচারপতি বাগচী।
২০২৬ সালের সংশোধনের ফলে ‘বন্দে মাতরম’-কেও জাতীয় সঙ্গীতের মতো আইনের সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। কেউ ইচ্ছা করে এই গান গাওয়ায় বাধা দিলে বা গান গাওয়ার সময় কোনও সভায় গোলমাল করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা দু’টিই হতে পারে। গত আগস্টে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সংশোধিত আইন কার্যকর হয়েছে।
টিএম কৃষ্ণের অভিযোগ, এই আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট গান গাওয়ার ক্ষেত্রে পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁর আবেদনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এমন নির্দেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে সরকারি ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক গাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কৃষ্ণের প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর আদালতে বলেন, ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বা ‘জাতীয় গান’-এর অর্থ আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ফলে কোন কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে বলে তাঁর দাবি। তাঁর বক্তব্য, কোনও অফিস মেমোর মাধ্যমে এমন বিষয় নির্ধারণ করা ঠিক নয়, যার ভিত্তিতে কাউকে জেলে পাঠানোর মতো শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’-এর শেষ চারটি স্তবকে বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। তাই কোনও ব্যক্তি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ওই অংশ গাইতে না চাইলে তাঁকে শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কৃষ্ণের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিষয়টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত।
মামলায় ১৯৮৬ সালের ‘বিজো ইমানুয়েল’ রায়কেই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই মামলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়া তিন স্কুলপড়ুয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা মামলাটিকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রচার না করার অনুরোধ জানান। আদালতে তাঁর মন্তব্য নিয়েও দু’পক্ষের মধ্যে তর্ক হয়।
এখন কেন্দ্রের জবাবের পর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে। মূল প্রশ্ন হল, সংশোধিত আইনের আওতায় ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কোন ধরনের আচরণ শাস্তিযোগ্য এবং ধর্মীয় বা বিবেকগত কারণে কেউ গানটি না গাইলে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। এই বিষয়গুলিই পরবর্তী শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


