দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের একটি পুরনো মামলার তদন্ত ফের শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে কেরল সরকার। রাজ্যের পূর্ত দফতরের সচিব থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ এবং মালয়েশীয় এক ইঞ্জিনিয়ারের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই তদন্ত। কেরলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা রাজ্যের ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-কোরাপশন ব্যুরোকে (VACB) নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের সময় আগের অনুসন্ধানে কোনও বহিরাগত বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
২০০৬ সালে কেরল স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (KSTP) আওতায় এমসি রোড উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন মালয়েশিয়ার সিভিল ইঞ্জিনিয়ার লি সি বিন। তিনি ওই প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন। প্রকল্পটি ভারত ও মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগে চলছিল। সেই সময় কেরলের পূর্ত দফতরের সচিব ছিলেন জ্ঞানেশ কুমার।
লি সি বিনের আত্মহত্যার পর তাঁর লেখা একটি সুইসাইড নোটে জ্ঞানেশ কুমারের নাম ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে সে সময় তদন্ত শুরু হলেও তা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ। সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা মালয়ানকীজু বেণুগোপাল ওই ঘটনার তদন্ত ফের শুরু করার দাবি জানিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই বর্তমান সরকার নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলিতে জানানো হয়েছে।
কেরল সরকারের অভিযোগ, পূর্ত দফতরের সচিব থাকাকালীন ঠিকাদারদের সরকারি কাজের বরাত দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অপরাধমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছিল। আগেও এই অভিযোগের তদন্ত হয়েছিল। তবে সেই তদন্ত কেন বন্ধ হয়ে গেল, এবং তদন্তের গতিপথে কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপ ছিল কি না—নতুন তদন্তে সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
এদিকে, দেশজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে কেন্দ্র করে আগেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার লিখিত ভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে SIR, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন-বিয়োজন এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়ও ছিল।
তবে নির্বাচন কমিশন ওই রিপোর্টের পর জানিয়েছিল, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মতামত বা পরামর্শ থাকা স্বাভাবিক এবং গত এক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল। ফলে দুই কমিশনারের আপত্তিকে কেন্দ্র করে যে ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে কমিশনের সঙ্গে প্রতিবেদনের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
SIR-কে কেন্দ্র করে জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিরোধী দলগুলি পদত্যাগের দাবিও তুলেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁর কেরল সরকারের আমলের ২০০৬ সালের মামলা ফের খোলার সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই তদন্তটি জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশনে যোগ দেওয়ার আগের সময়ের অভিযোগ নিয়ে। ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইনে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য CEC ও নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে মামলা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট সুরক্ষা রয়েছে। কেরলের বর্তমান তদন্তে যে সময়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তা তাঁর ২০০৬ সালের পূর্ত দফতরের দায়িত্ব পালনের সময়কার।
ফলে SIR নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যেই প্রায় দুই দশক পুরনো অভিযোগের তদন্ত ফের শুরু হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। তদন্তে শেষ পর্যন্ত কী উঠে আসে, এখন সেদিকেই নজর।


