২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে ঠিক কী ধরনের চোট লেগেছিল, তা নিয়ে পাঁচ বছর পর ফের উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি। সম্প্রতি নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ওই ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট লাগলেও কোনও ফ্র্যাকচার হয়নি। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে বাংগুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের মেডিক্যাল রিপোর্টও রয়েছে। সেই রিপোর্টে ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের প্রমাণ নেই বলে দাবি করেছেন শুভেন্দু। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকার তদন্তও করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই বিতর্কের মধ্যেই এবার মুখ খুললেন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ তথা চিকিৎসক শান্তনু সেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২১ সালের পায়ের চোটের চারটি ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। ছবিগুলির একটিতে গোড়ালির কাছে কালশিটের দাগ, অন্যটিতে রক্তপাতের চিহ্ন এবং বাকি দু’টিতে প্লাস্টার করা পা দেখা যাচ্ছে বলে দাবি তাঁর।
ছবিগুলি পোস্ট করে শান্তনু সেন তৎকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং মমতার চিকিৎসা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, ১০ মার্চ চোট পাওয়ার পর এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তোলা ছবিতে গোড়ালির উপরে কালশিটে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু রক্তপাতের চিহ্ন ছিল না। পরে কীভাবে রক্তপাতের ছবি সামনে এল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
শান্তনুর বক্তব্য, চিকিৎসক হিসেবে তিনি কোনও অভিযোগ করছেন না, তবে কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাঁর দাবি, আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে রক্তপাত হলে সেটি সাধারণত আঘাতের সময়ই হওয়ার কথা। কয়েক দিন পরের কোনও ছবিতে রক্তপাতের চিহ্ন দেখা গেলে তার সঙ্গে আগের আঘাতের সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করা কঠিন। প্লাস্টার নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাধারণত প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা খুলে দেওয়া হয়।
শুধু পায়ের চোট নয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং তথাকথিত ‘থ্রেট কালচার’ নিয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিকিৎসক এসপি দাসকে নিশানা করেন শান্তনু। তাঁর দাবি, এই অভিযোগগুলি তিনিই প্রথম তুলেছিলেন এবং তার জেরেই তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল।
তবে শান্তনু সেনের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে তৃণমূল। দলের নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় বলেন, শান্তনু সেন তৃণমূলে থাকার সময় রাজ্যসভার সাংসদ ও কাউন্সিলর হয়েছেন, এমনকি তাঁর স্ত্রীও কাউন্সিলর হয়েছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় পরে একজন প্রবীণ রাজনীতিকের পুরনো আঘাত নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তোলা অনুচিত।
এর আগে একই ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২ অক্টোবর নন্দীগ্রামে প্রচারের সময় তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে গুরুতর চোট বা ফ্র্যাকচার হয়নি। পরে নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বাংগুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের ১১ মার্চ ২০২১-এর একটি রিপোর্ট দেখিয়ে দাবি করেন, সেখানে ‘ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের কোনও প্রমাণ নেই’ বলা হয়েছিল। এই দাবির ভিত্তিতেই রাজ্য সরকার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে ২০২১ সালের ঘটনার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, নন্দীগ্রামের বিরুলিয়ায় প্রচারের সময় তাঁর গাড়ির দরজা পায়ে ধাক্কা মারে এবং তিনি আহত হন। পরে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং প্লাস্টার করা পায়ে হুইলচেয়ারে প্রচার চালাতে দেখা যায়। তৎকালীন চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্টে পা ও গোড়ালিতে চোটের কথাও উঠে এসেছিল।
এদিকে, শুভেন্দুর অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে CID তদন্তের কথাও সামনে এসেছে। নির্বাচন বিধি কার্যকর থাকায় উপনির্বাচন শেষ হওয়ার পর তদন্ত নিয়ে বিস্তারিত পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এই তদন্ত আরও গতি পেতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
পুরনো সেই ঘটনা ঘিরে একদিকে শুভেন্দুর ‘ফ্র্যাকচার হয়নি’ দাবি, অন্যদিকে চিকিৎসক শান্তনু সেনের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ২০২১-এর নন্দীগ্রামের সেই ‘পায়ের চোট’ আবারও রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

