Friday, March 6, 2026
28.9 C
Kolkata

মাদ্রাসা নিয়ে কুৎসা প্রচারকারী বিজেপি কি জানে, ভারতে শিক্ষার কাঠামো নির্মাণের মূল কারিগর মাদ্রাসা?

রাজ্য ও দেশীয় রাজনীতিতে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সমাজের কিছু অংশের মানুষদের বলতে শোনা যাচ্ছে, মাদ্রাসায় নাকি কেবল ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় এবং এখান থেকেই উগ্রপন্থা বা সন্ত্রাস জন্ম নেয়। তবে শিক্ষা ও ইতিহাসের আলোকে এই বক্তব্য যে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য পোষণকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বহু মুসলমান ভাই-বোনেরা।তাদের বক্তব্য, মাদ্রাসা শিক্ষা কখনও শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানে বিজ্ঞান, গণিত, সমাজবিদ্যা, দর্শনসহ নানা আধুনিক বিষয় শেখানো হয়। অনেক শিক্ষাবিদের মতে, উপমহাদেশে আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি গড়তে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিশ্বের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোর শিকড় মাদ্রাসা ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে বাগদাদে গড়ে ওঠা নিযামিয়া মাদ্রাসাকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার পথপ্রদর্শক বলে উল্লেখ করেছেন বহু আন্তর্জাতিক গবেষক। ইউরোপ ও আফ্রিকার শিক্ষা কাঠামোর ওপরও এই মডেলের প্রভাব ছিল। শুধু তাই নয় ইসলামি ইতিহাসের গবেষক কে আলি লিখেছেন, স্পেনের কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় আদতে একটি মাদ্রাসাই ছিল, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যা পড়ানো হতো। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা, যিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত, তিনিও মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। একইভাবে দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আল-কিন্দি, যিনি শতাধিক মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তাঁর শিক্ষাজীবনও মাদ্রাসা কেন্দ্রিক।

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এসব তো বহু শতাব্দী আগের কথা, বর্তমান সময়ে মাদ্রাসা কী দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকেই তাকাতে হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক ও হাইকোর্টের বিচারপতি জাস্টিস সৈয়দ আমির আলি, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ কুদরত-ই-খোদা, তাঁদের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে মাদ্রাসার সংযোগ ছিল। এমনকি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা মুজাফফর আহমেদ এবং বিপ্লবী কবি মাওলানা হসরত মোহানিও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।

বর্তমান সময়েও মাদ্রাসা নিয়ে বিতর্ক থেমে নেই। সাম্প্রতিক কালে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে নেতা-মন্ত্রীরা প্রচার করছে, মাদ্রাসা থেকে নাকি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হয় না। বরং এখান থেকেই অপরাধমূলক মানসিকতা জন্ম নেয়। এই বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেশের একাধিক রাজ্যে মাদ্রাসা ভাঙার ঘটনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর বুলডোজার চালানোর নজির সামনে এসেছে। একাংশের ধারণা, মাদ্রাসাকে কেবল মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে বিদ্বেষ ছড়ানোই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজ্যের সরকার অনুমোদিত মাদ্রাসাগুলোর পাঠক্রমে সাধারণ স্কুলের মতোই বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও ভূগোল পড়ানো হয়। হাই-মাদ্রাসাগুলিতে কেবল অতিরিক্ত একটি বিষয়ের মাধ্যমে ইসলাম পরিচয় যুক্ত থাকে। সিনিয়র মাদ্রাসায় আরবি ও ধর্মতত্ত্ব থাকলেও বিজ্ঞান বিভাগ চালু রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের মাদ্রাসাগুলিতে পড়ুয়াদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অমুসলিম। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি, প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক মুসলমান নন। এমনকি বহু মাদ্রাসার প্রধানশিক্ষকও হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই শিক্ষার্থীরা বা শিক্ষকরা কি উগ্রপন্থী? মাদ্রাসা থেকে যে আজও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা তৈরি হচ্ছেন, তার উদাহরণও রয়েছে। ২০১৯ সালে হুগলির এক হাই-মাদ্রাসার ছাত্র ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় উচ্চ স্থান অর্জন করে ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক হিসেবে দায়িত্ব নেন। বীরভূমের এক মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রী আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। মুর্শিদাবাদের এক মাদ্রাসার ছাত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা পদার্থবিজ্ঞানীদের অন্যতম। সম্প্রতি কাশ্মীরের এক মাদ্রাসা ছাত্রী নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা আইএএস, আইপিএস ও রাজ্য সিভিল সার্ভিসে সফল হয়েছেন।

রাজ্যের বাজেটে সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের জন্য বরাদ্দ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এই বরাদ্দ কেবল মাদ্রাসার জন্য নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও পারসি সম্প্রদায়ও অন্তর্ভুক্ত। এই তহবিল থেকে বহু স্কুল, কলেজ ও হস্টেল নির্মাণ হয়েছে, যেখানে সাধারণ শিক্ষাই দেওয়া হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও মাদ্রাসা শিক্ষিতদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা ভাসানী, এঁরা সকলেই স্বাধীনতার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির শিক্ষাজীবনের সঙ্গেও মাদ্রাসার যোগ ছিল।

Hot this week

ইরানের নেতৃত্বে কি বসতে চলেছেন খামেনেই-র পুত্র?

ইরানের রাজনীতিতে শিগগিরই বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দেশের...

পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কড়া অবস্থান নিলো ইরান

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে ইরান নিজেদের নিরাপত্তা...

তামিলনাড়ুতে জাতিগত হামলা: প্রতিবন্ধী দলিত ও ওড়িশার শ্রমিক নিহত, অভিযুক্তদের আগে রয়েছে সহিংসতার ইতিহাস

তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার নাঙ্গুনেরি এলাকার পেরুমপাথ্তু গ্রামে ভয়াবহ হামলার...

Topics

ইরানের নেতৃত্বে কি বসতে চলেছেন খামেনেই-র পুত্র?

ইরানের রাজনীতিতে শিগগিরই বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দেশের...

পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কড়া অবস্থান নিলো ইরান

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে ইরান নিজেদের নিরাপত্তা...

তামিলনাড়ুতে জাতিগত হামলা: প্রতিবন্ধী দলিত ও ওড়িশার শ্রমিক নিহত, অভিযুক্তদের আগে রয়েছে সহিংসতার ইতিহাস

তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার নাঙ্গুনেরি এলাকার পেরুমপাথ্তু গ্রামে ভয়াবহ হামলার...

উত্তরাখণ্ডে নাবালিকাকে জোর করে ‘জয় শ্রী রাম’ বলানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার অভিযুক্ত!

উত্তরাখণ্ডের উধম সিং নগর জেলায় একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই...

Related Articles

Popular Categories