কর্ণাটকে চলমান বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকার পুরনো নথির সঙ্গে বর্তমান তথ্যের অসঙ্গতির জেরে একাধিক বিশিষ্ট ভোটারের নাম ‘আনম্যাপড’ বা অচিহ্নিত হিসেবে উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি, জেরোধার সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিখিল কামাথ এবং কন্নড় অভিনেতা শিবরাজকুমার।
এর মধ্যেই ভারতরত্নপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী অধ্যাপক সিএনআর রাও-কে SIR সংক্রান্ত নোটিশ পাঠানোর দাবি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। বুধবার নির্বাচন কমিশন এবং গ্রেটার বেঙ্গালুরু অথরিটি (GBA) স্পষ্ট করেছে, রাও-কে কোনও নোটিশ পাঠানো হয়নি।
GBA-র প্রধান কমিশনার তথা বেঙ্গালুরু আরবান জেলার নির্বাচন কর্মকর্তা এম মহেশ্বর রাও জানিয়েছেন, মাল্লেশ্বরম বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকার SIR প্রক্রিয়ায় অধ্যাপক সিএনআর রাও-কে কোনও নোটিশ জারি করা হয়নি। ভোটার তালিকায় তাঁর নামের ক্ষেত্রে একটি অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার (BLO) তাঁকে নোটিশ না পাঠিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁর নাম বহাল রাখার সুপারিশ করেন।
অর্থাৎ, সিএনআর রাও-কে শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছিল—এমন খবরও খারিজ করেছে GBA।
অন্যদিকে, নন্দন নিলেকানি এবং নিখিল কামাথের তথ্যেও পুরনো নির্বাচনী নথির সঙ্গে অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল। নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেসে তাঁদের নামে নোটিশ তৈরি হয়েছিল বলে জানা গেলেও, সেই নোটিশ তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
কন্নড় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা শিবরাজকুমারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও বর্তমান তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতির কারণে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুনানির জন্য নোটিশ তৈরি করে। তবে তাঁকে নথিপত্র নিয়ে GBA দফতরে হাজির হতে হয়নি। নির্বাচন আধিকারিকরা তাঁর বাড়িতেই গিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেন।
নির্বাচন কমিশনের এক প্রবীণ আধিকারিক জানিয়েছেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুনানির জন্য সশরীরে উপস্থিতির প্রয়োজন না-ও হতে পারে। তাঁদের বাসভবনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট BLO-রা প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করতে পারেন। এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় বিচারক, সাংসদ, বিধায়ক, প্রবীণ রাজনীতিক, আমলা এবং ক্রীড়া ও চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে এখানেই প্রশ্ন উঠছে সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রে নিয়মের প্রয়োগ নিয়ে। অভিযোগ, ভোটার তালিকায় সামান্য তথ্যগত অসঙ্গতি থাকলেও অনেক সাধারণ ভোটারকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ফলে তাঁদের কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে বা কী নথি জমা দিতে হবে—তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বেঙ্গালুরুর এক প্রবীণ বাসিন্দার ক্ষেত্রেও বর্তমান ভোটার তালিকা এবং ২০০২ সালের নথিতে নামের বিন্যাসে সামান্য পার্থক্যের কারণে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তাঁর দাবি, নামের বানানে কোনও মৌলিক পার্থক্য ছিল না। সম্ভবত পুরনো নথি ডিজিটাইজ করার সময় এই পার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
শুধু নোটিশ পাওয়া নয়, তার পরবর্তী প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশিত তালিকায় শুনানির তারিখ, সময় বা স্থান উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ। আবার কোনও কোনও ভোটার জানিয়েছেন, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওয়েবসাইটে আপলোড করা তালিকা পরবর্তী সময়ে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ভোটারদের একাংশ নোটিশের সম্পূর্ণ প্রতিলিপি ইংরেজিতেও চেয়েছেন। অনলাইনের পাশাপাশি মুদ্রিত প্রতিলিপির দাবিও উঠেছে। কর্ণাটকের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ভি. আনবু কুমারের আশ্বাস অনুযায়ী, কন্নড় ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই নোটিশের কপি চাওয়া হয়েছে।
ভোটারদের বক্তব্য, তথ্য সংগ্রহের ফর্মের তুলনায় SIR-এর নোটিশ অনেক বেশি জটিল। একাধিক ধরনের অসঙ্গতি এবং নানা নির্দেশাবলি থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে নোটিশের বিষয়বস্তু বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে একদিকে বিশিষ্ট ভোটারদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা, অন্যদিকে সাধারণ ভোটারদের নোটিশ নিয়ে তৈরি বিভ্রান্তি—এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে কর্ণাটকের SIR প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে।


