Saturday, September 5, 2026
28 C
Kolkata

হুগলি জেলার পুইনানে বিশ্ব ইজতেমা: ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবতার এক মহোৎসব

ইনজামামুল মল্লিক: হুগলি জেলার পুইনান এ বছর সাক্ষী থাকল এক বিরল ঐতিহাসিক ঘটনার। জানুয়ারি দুই থেকে পাঁচ — চারদিন ধরে এখানে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব ইজতেমা। ৩৩ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এলো এই বিশাল ইসলামিক সমাবেশ, যা শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবতার এক বৃহৎ মিলনমেলায় পরিণত হলো। তাবলিগি জামাতের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশ্ব ইজতেমায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি একশোরও বেশি দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ অংশ নেন।

প্রায় সাড়ে সাত হাজার বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠে ইজতেমা চত্বর। পুইনানের দিকে যাওয়া প্রতিটি রাস্তায় দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। জুম্মা নামাজের কাতার ছড়িয়ে পড়ে মাঠ পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রাম অবধি। এত মানুষের জমায়েত — তবুও চারপাশে শৃঙ্খলা, নীরবতা এবং শান্ত পরিবেশ। কোনো স্লোগান নয়, কোনো হইচই নয় — বরং এক আধ্যাত্মিক নিস্তব্ধতা। একসঙ্গে হাজারো মানুষ সিজদায় অবনত হলে পুরো এলাকা যেন অন্য এক অনুভূতিতে ঢেকে যায়। এটি মানুষের ঐক্য, আস্থা ও ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত উদাহরণ।

এই আয়োজনে সহাবস্থানের দৃশ্যও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। যে বিশাল জমিতে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছে তার বড় অংশই স্বেচ্ছায় দিয়েছেন স্থানীয় হিন্দু কৃষক পরিবারেরা। অনেক হিন্দু পরিবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মুসলিম অতিথিদের জন্য চা, বিস্কুট, খেজুর ও জল বিতরণ করেছেন। গ্রামের পথে পথে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরগুলো যেন ইজতেমার ময়দানের পথ দেখিয়েছে দুর দূরান্ত থেকে আসা মুসলিম অতিথিদের। হাজার হাজার হিন্দু মানুষ এসেছিলেন, কেউ এসেছে ব্যবসা করতে, কেউ আবার ইজতেমার মাটি নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে, কারণ এই মাটিতে কোটি কোটি মুসলিম নামাজ পড়েছেন, দেশের জন্য, দুনিয়ার জন্য, মানিবতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চেয়েছেন এই মাটির উপর বসে  — এই মিলনমেলা বাংলার সামাজিক সংস্কৃতিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

ইজতেমা চত্বরজুড়ে প্রতিটি দেশ, রাজ্য ও জেলার জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা; বক্তব্য শোনার জন্য বিশাল মাজমা; খাবার জন্য ক্যান্টিন; হাজার হাজার কল ও বাথরুমসহ পানির সুব্যবস্থা — সবই গড়ে উঠেছে কয়েক মাসের প্রস্তুতিতে। সঙ্গে ছিল অস্থায়ী হাসপাতাল, শতাধিক ফ্রি মেডিসিন কাউন্টার ও হেলথ ক্যাম্প। একশরও বেশি দেশ থেকে মানুষের আগমন — তিন দিনে কয়েক কোটি মানুষের অংশগ্রহণ — তবু কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই , আছে কেবল শান্তি, শৃঙ্খলা ও শালীনতা।

এই সমাবেশের শতবর্ষের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় — কোনো সন্ত্রাস, কোনো অসামাজিক কার্যকলাপ, কোনো উসকানি এখানে স্থান পায় না। কারণ ইসলাম শিক্ষা দেয় সংযম, শৃঙ্খলা ও শান্তির পথ অনুসরণ করতে।

কেউ কেউ কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে এসেছেন; খোলা আকাশের নিচে পাতলা তাঁবুর মধ্যে রাত কাটিয়েছেন — কোনো ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং ঈমান, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার আহ্বানেই।

এই ইজতেমা শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয় — এটি অনেকের জীবনে পরিবর্তনেরও একটি উপলক্ষ। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, এখানে এসে মানুষের ভেতর একধরনের আত্মসমালোচনা কাজ করে। বড় বড় আলেম ও বক্তারা সহজ ভাষায় নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের কথা বলেন। অনেকেই প্রতিজ্ঞা করেন — মিথ্যা, নেশা ও অন্যায় থেকে দূরে থেকে নিয়মিত নামাজ ও ভালো কাজের পথে চলবেন। একই সঙ্গে পৃথিবীর নানা দেশের মুসলমানদের একসঙ্গে দেখতে পারা অংশগ্রহণকারীদের মনে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।

বিশ্ব ইজতেমা শেষে সকলে ফিরে যান নিজেদের গ্রাম ও শহরে — শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে নয়, বরং শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবতার বার্তা নিয়ে। পুইনানের এই আয়োজন তাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল — ধর্ম যখন বিভাজন নয়, বরং মানুষকে কাছাকাছি আনার সেতু হয়ে ওঠে, তখন তা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতির এক শক্তিশালী উদাহরণ সৃষ্টি করে।

Hot this week

গাঁজা সেবনের অভিযোগে ফুকেত-দিল্লি ফ্লাইটের সেই পাইলটকে এবার বরখাস্ত করল এয়ার ইন্ডিয়া!

ফুকেত থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে বিপদের মুখে পড়া এয়ার...

Topics

‘আমরা কি কারও গোলাম?’ টাটাদের ব্যবসা গোটানোর নির্দেশ কেনিয়ার রাষ্ট্রপতির

কেনিয়ায় বড়সড় ধাক্কার মুখে টাটা গোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সামলানোর...

অগ্নিনিরাপত্তায় বড়সড় গলদ! অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস খালি করার কড়া নোটিস দমকলের

কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে অবস্থিত ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...

Related Articles

Popular Categories