গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির হারকে অর্থনীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সেই পরিসংখ্যান নিয়েই এবার উঠল গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ, জিডিপি বৃদ্ধির হিসাবের মধ্যে রয়েছে কারচুপি। আর এই বিস্ফোরক দাবি কোনও বিরোধী নেতার নয়, এসেছে মোদি সরকারেরই প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গের কাছ থেকে।
গত অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধির হার, জিডিপির মোট অর্থমূল্য এবং মানুষের ক্রয়প্রবণতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে গর্গের দাবি, সদ্য প্রকাশিত জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তাঁর বক্তব্য, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ দেখানো হলেও গত বছরের একই সময়ে প্রথমে বৃদ্ধির হারও ৭.৮ শতাংশই দেখানো হয়েছিল। পরে সংশোধিত হিসাবে সেটি কমিয়ে ৬.৯ শতাংশ করা হয়।
শুধু বৃদ্ধির হার নয়, জিডিপির মোট অর্থমূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গর্গ। তাঁর দাবি, গত বছরের সংশ্লিষ্ট ত্রৈমাসিকে জিডিপির পরিমাণ প্রথমে প্রায় ৮৬ লক্ষ কোটি টাকা দেখানো হলেও পরে সংশোধিত হিসাবে তা প্রায় ৮০ লক্ষ কোটি টাকায় নেমে আসে। তাঁর প্রশ্ন, কেন পরবর্তীতে এই পরিসংখ্যানগুলি সংশোধন করে কমানো হয়েছিল?
গর্গের মতে, এই ধরনের সংশোধনের ফলে চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক রকমের শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। তাঁর দাবি, বর্তমান মূল্যে প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার খুব বেশি হলে ২.৬ শতাংশের কাছাকাছি। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পণ্য ও পরিষেবার মূল্য সমন্বয় করলে প্রকৃত অর্থে জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্য বললেও ভুল হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
গর্গ শুধু মোদি সরকারের প্রাক্তন অর্থসচিবই নন। তিনি বিশ্ব ব্যাঙ্কের এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মোদি সরকারের আমলেই বিদ্যুৎ সচিবের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ফলে তাঁর এই বিশ্লেষণ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গর্গের বক্তব্যকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে বিরোধীরাও। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের অভিযোগ, প্রচারের মাধ্যমে জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে মানুষের ধারণা বদলানো গেলেও দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলানো যায় না।
জিডিপি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গভর্নর রঘুরাম রাজনও। তাঁর বক্তব্য, যদি অর্থনীতি এতটাই শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে কর্মসংস্থান কোথায়? শিল্পে বিনিয়োগের জোয়ারই বা কোথায়? বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) প্রত্যাশিত হারে আসছে না কেন—এই প্রশ্নগুলিই তুলেছেন তিনি।
বিরোধীদের এই আক্রমণের জবাবে পাল্টা যুক্তি দিয়েছে বিজেপি। তাদের দাবি, জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, গর্গের বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই ভুল রয়েছে। কারণ আগের আর্থিক বছরে জিডিপি হিসাবের ভিত্তিবর্ষ ও মাপকাঠি ছিল আলাদা। পরবর্তীতে সেই পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং ২০২২ সালে নির্ধারিত নতুন মাপকাঠি চলতি অর্থবর্ষ থেকে কার্যকর হয়েছে।
তবে গর্গ নিজের অবস্থানে অনড়। তাঁর দাবি, মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত হার এবং মানুষের ক্রয়প্রবণতার তথ্য যথাযথভাবে বিবেচনা না করলে অর্থনীতির আসল ছবি সামনে আসবে না। তাঁর মতে, গত বছরের তুলনায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও লেনদেনের প্রবণতায় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
গর্গের বিশ্লেষণে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, শেয়ার বাজারের অস্থিরতা, টাকার মূল্যপতন এবং গ্রাম ও শহর—উভয় ক্ষেত্রেই আর্থিক লেনদেন কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলিও উঠে এসেছে। তাঁর আশঙ্কা, এই সমস্ত সূচক অর্থনীতিতে মন্দার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে। অথচ সদ্য প্রকাশিত জিডিপি রিপোর্টে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি উঠে আসছে বলেই তাঁর দাবি।
এদিকে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়েল বিরোধী শিবিরের অর্থনীতি সংক্রান্ত সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, সমালোচকদের হাতে কোনও কাজ নেই, তাঁরা শুধু টেলিভিশন চ্যানেলে বসে বাজার গরম করছেন।
কিন্তু তাতে বিতর্ক থামছে না। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টি—একাধিক বিরোধী দল জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে যদি সরকারি পরিসংখ্যানের এতটা ফারাক থাকে, তাহলে জিডিপির হিসাব নিয়েও কি এবার নতুন করে তদন্ত ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন?


