ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সামনে নতুন করে অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ, রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শুল্ক আরোপের একটি নতুন বিল নিয়ে এগোচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। এই প্রস্তাব আইনে পরিণত হলে ভারতের ওপরও তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। এমন সময় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এখনও শেষ হয়নি।মার্কিন সিনেটে ইতিমধ্যেই ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ বিলটি সমর্থন পেয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা কয়েকটি দেশের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর ক্ষমতা পাবেন। এই তালিকায় রয়েছে ভারত, চিন, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া এবং আজারবাইজান। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়া থেকে আমদানি হওয়া কিছু পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথও খুলে যাবে।ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও বেড়েছে। চলতি বছরের মে মাসে দেশের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে। ফলে নতুন মার্কিন আইন কার্যকর হলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ এবং আমদানি ব্যয় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।এই বিষয়ে ভারত সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, কোনো বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার আগে সরকার অনুমানের ভিত্তিতে মন্তব্য করতে চায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি।অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে তেল কিনতে হলে ভারতের পরিবহণ ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। তার প্রভাব জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার খরচেও পড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।এর মধ্যেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। ভারতের দাবি, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণ করা হবে না যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারত পিছিয়ে পড়ে। নয়াদিল্লি চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্য যেন যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়। সেই নিশ্চয়তা না মিললে চুক্তি কার্যকর করা কঠিন হবে বলে সরকারের অবস্থান।অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি জেনেরিক ওষুধের ওপর ধাপে ধাপে উচ্চ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে। এতে ভারতের ওষুধ শিল্প ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জেনেরিক ওষুধ উৎপাদক ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ জেনেরিক ওষুধ ভারত থেকেই রপ্তানি করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ভারতের কিছু পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে, যা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে অর্থনৈতিক স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন বাণিজ্যকে কৌশলগত চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক, বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা আরও কঠিন হতে পারে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে দুই দেশই, কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশিয়ার থেকে পণ্য আমদানি করা দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের কড়া শুল্ক! ভারত মার্কিনী সম্পর্কে কি তিক্ততার স্বাদ?
Popular Categories


