Tuesday, July 21, 2026
26.2 C
Kolkata

স্কুল বিমুখ হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা, বিগত তিন বছরের সরকারি রিপোর্টেই ধরা পড়লো উদ্বেগজনক চিত্র

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বশেষ রিপোর্ট। প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত স্তরে গত তিন বছর ধরে একটানা কমেছে স্কুলে ভর্তির সংখ্যা। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা নেমে এসেছে ২৪.৬৯ কোটিতে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ লক্ষ কম। শুধুমাত্র একটি বছর নয়, ২০২২-২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ভর্তি কমেছে প্রায় ৫০ লক্ষ। এই প্রবণতা শুধু যে সংখ্যাগত তার চেয়েও বড় কথা, এটি শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিমূলেই কিছু গঠনগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরকারি রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলোতে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। ২০২২-২৩ সালে এই স্কুলগুলোতে ভর্তি ছিল ১৩.৬২ কোটি, যা দুই বছরের মধ্যে কমে দাঁড়িয়েছে ১২.১৬ কোটিতে। অর্থাৎ, প্রায় ১.৫ কোটি শিক্ষার্থী সরকারি ব্যবস্থা থেকে সরে গেছে। এই সংকটকে আরও গভীর করে দেখাচ্ছে বিপরীতমুখী আরেকটি পরিসংখ্যান: একই সময়ে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি বেড়েছে ৮.৪২ কোটি থেকে ৯.৫৯ কোটিতে। আজ দেশের মোট স্কুলপড়ুয়ার ৩৯ শতাংশই পড়াশোনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

এই হ্রাসের পেছনে সরকারি আধিকারিকদের কিছুটা ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও শিক্ষামহলের এক বড় অংশ মনে করেন, এই প্রবণতা মহামারির প্রভাব কাটার পরও থামেনি, বরং তা ব্যবস্থাগত দুর্বলতারই প্রকাশ। মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে ইউনিফর্ম বা সাইকেল প্রদানের মতো সরকারি উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ সরকারি স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তা ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের।

একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে সরকারি স্কুলগুলোর দুরবস্থা, অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং শিক্ষক সংকটকে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, সরকারি স্কুলের শিক্ষকরাও নিজের সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। এই অবস্থায় একজন সাধারণ অভিভাবক কীভাবে সরকারি স্কুলের ওপর ভরসা রাখবেন? এছাড়াও, আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমের স্কুলগুলোর প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া এবং ইংরেজি মাধ্যম বা সিবিএসই/আইসিএসই বোর্ডের বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝোঁকও এই পরিবর্তনের একটি বড় কারন।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর মতে, ২০২০ সালের নতুন শিক্ষানীতির পর থেকে শিক্ষাখাতের যে বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত হয়েছে, এই রিপোর্ট তারই ফলাফল। সরকারি স্কুলগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল রেখে বেসরকারি খাতের জন্য পথ সুগম করা হচ্ছে, যা শেষমেশ গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রাথমিক স্তরে, বিশেষ করে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে, ভর্তি সবচেয়ে বেশি কমেছে। অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরে (নবম-দশম শ্রেণি) স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটাও একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সংকট কাটাতে শুধু সুযোগ-সুবিধা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, পঠন-পাঠনের পদ্ধতিকে আরও আকর্ষণীয় করা এবং সরকারি স্কুলের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করাটা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মোট কথা, পর পর তিন বছর ধরে স্কুলে ভর্তি কমা কোনও দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার ইঙ্গিতবাহী। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ও সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে জোরদার করতে না পারলে শিক্ষার এই বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের মাশুল দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।

Hot this week

‘ক্ষমা চাও’ – ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে অভিষেককে সময় বেঁধে দিলেন মদন

২১ জুলাইয়ের সভার দিন ফের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৃণমূলের...

অফিসের বাথরুমে ঝুলন্ত দেহ, ত্রিপুরার ডিজিপির মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে ধোঁয়াশা

ত্রিপুরার পুলিশ মহলে শোকের ছায়া। সোমবার আগরতলায় পুলিশ সদর...

Topics

‘ক্ষমা চাও’ – ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে অভিষেককে সময় বেঁধে দিলেন মদন

২১ জুলাইয়ের সভার দিন ফের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৃণমূলের...

অফিসের বাথরুমে ঝুলন্ত দেহ, ত্রিপুরার ডিজিপির মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে ধোঁয়াশা

ত্রিপুরার পুলিশ মহলে শোকের ছায়া। সোমবার আগরতলায় পুলিশ সদর...

‘ঘোর পাপ হয়েছে’—দু’মাস পর নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে মুখ খুললেন মোদি

নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। অনেক...

দশ বছরে সংঘ-ঘনিষ্ঠ ২০ সংস্থাকে ৬৬৮ কোটির বেশি অনুদান! ওএনজিসির সিএসআর তহবিল নিয়ে বিতর্ক

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থাকে সরকারি...

Related Articles

Popular Categories